
প্রায় এক দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে ভাঁজযোগ্য (Foldable) আইফোন বাজারে আনতে যাচ্ছে অ্যাপল। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রথমবারের মতো ফোল্ডেবল আইফোন উন্মোচন করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় দুই দশকের আইফোন ইতিহাসে নতুন এই মডেলকে অন্যতম বড় নকশাগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বহুল প্রত্যাশিত এই ফোনটির দাম ২ হাজার ডলারের বেশি হতে পারে। বেশি স্টোরেজের সংস্করণের দাম ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় ফোনটির আনুমানিক দাম দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৪৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
কুকের আগ্রহে গতি পায় ফোল্ডেবল প্রকল্প
অ্যাপলের ফোল্ডেবল ফোন তৈরির গবেষণা অবশ্য প্রায় এক দশক আগেই শুরু হয়েছিল। ২০১৯ সালে স্যামসাং প্রথম গ্যালাক্সি ফোল্ড বাজারে আনার আগেই অ্যাপলের অভ্যন্তরে ভাঁজযোগ্য ফোন ও ডিসপ্লে নিয়ে গবেষণা চলছিল।
প্রায় ২০২০ সালে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক এশিয়া সফরে গিয়ে ভাঁজযোগ্য ফোনের জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখেন। তখন স্যামসাং, হুয়াওয়েসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফোল্ডেবল ফোন বাজারে জায়গা করে নিচ্ছিল। এতে অ্যাপলেরও এই বাজারে প্রবেশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কুকের আগ্রহ বাড়ে।
এরপর প্রকল্পটির কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। শুরুতে অ্যাপলের একটি ধারণা ছিল, এমন একটি ভাঁজযোগ্য ডিভাইস তৈরি করা হবে, যা খুললে বড় ট্যাবলেটে পরিণত হবে। তবে পরে সেই পরিকল্পনা বদলে ফোল্ডেবল আইফোন তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অ্যাপলের ভেতরে নতুন ফোনটির কোডনেম রাখা হয়েছে V68। উন্নয়ন পর্যায়ে কেউ কেউ এটিকে ‘আইফোন আল্ট্রা’ নামেও উল্লেখ করেছেন।
বর্তমানে অ্যাপলের সাধারণ আইফোনের দাম ৭৯৯ ডলার থেকে শুরু। আর আইফোন ১৭ প্রোর দাম শুরু ১ হাজার ৯৯ ডলার থেকে। এর তুলনায় নতুন ফোল্ডেবল মডেলের দাম হবে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
থাকছে বড় ভেতরের ডিসপ্লে
নতুন ফোল্ডেবল আইফোনে প্রায় ৭ দশমিক ৮ ইঞ্চির অভ্যন্তরীণ ডিসপ্লে থাকতে পারে। এটি অনেক অ্যান্ড্রয়েড ফোল্ডেবল ফোনের তুলনায় তুলনামূলক প্রশস্ত হবে। বড় পর্দায় ভিডিও দেখা, কাজ করা এবং একসঙ্গে একাধিক অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যাবে।
ফোনটির বাইরের ডিসপ্লে হবে প্রায় ৫ দশমিক ৫ ইঞ্চি। ভাঁজ করা অবস্থায় যাতে ফোনটি সহজে হাতে ধরা ও পকেটে রাখা যায়, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এর নকশা করা হয়েছে।
অ্যাপলের নকশাবিদেরা ডিভাইসটিকে ভাঁজ করা অবস্থায় প্রায় একটি পাসপোর্টের আকৃতির মতো কল্পনা করেছেন। পুরোপুরি খুললে এর আকৃতি অনেকটা অ্যাপলের ম্যাজিক ট্র্যাকপ্যাডের মতো হতে পারে।
ভাঁজের দাগ কমাতে নতুন প্রযুক্তি
ফোল্ডেবল ফোন তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ডিসপ্লেতে ভাঁজের দাগ কমানো। পাশাপাশি হিঞ্জের স্থায়িত্ব, নমনীয় কভার গ্লাস এবং ডিসপ্লের পেছনে ক্যামেরার বিভিন্ন উপাদান বসানো নিয়েও অ্যাপলকে প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় অ্যাপল উন্নত টাইটানিয়াম ও অ্যালুমিনিয়ামের হিঞ্জ ব্যবস্থা তৈরি করেছে। পাশাপাশি কর্নিংয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি বিশেষ কভার গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে।
অ্যাপলের দাবি, এসব প্রযুক্তির ফলে ডিসপ্লেতে ভাঁজের দাগ বর্তমান অনেক ফোল্ডেবল ফোনের তুলনায় কম দৃশ্যমান হবে।
দাম বেশি, থাকতে পারে কিছু সীমাবদ্ধতা
চড়া দাম নতুন ফোল্ডেবল আইফোনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ফোনটির পূর্ণাঙ্গ ডিসপ্লে ব্যবহারের জন্য সেটি খুলতে হবে। এ ছাড়া সাধারণ আইফোনের তুলনায় এর স্থায়িত্ব কিছুটা কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ক্যামেরা ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল হতে পারে এবং ব্যাটারি সক্ষমতাও সাধারণ আইফোনের তুলনায় কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারপরও অ্যাপলের কর্মীদের ধারণা, প্রতিষ্ঠানটি যতসংখ্যক ফোল্ডেবল আইফোন উৎপাদন করতে পারবে, সেগুলো বিক্রি হয়ে যেতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ফোল্ডেবল আইফোন বিক্রি হতে পারে।
আইডিসির জ্যেষ্ঠ স্মার্টফোন বাজার গবেষক নাবিলা পোপালের মতে, দাম বেশি হলেও নতুন ফোনটি বড় ধরনের সাফল্য পেতে পারে। তাঁর ধারণা, চীনের বাজারে এটি স্মার্টফোনের ‘বার্কিন’ হয়ে উঠতে পারে। বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড হার্মেসের জনপ্রিয় হ্যান্ডব্যাগ বার্কিন যেমন মর্যাদা ও বিলাসিতার প্রতীক, ফোল্ডেবল আইফোনও তেমন অবস্থান তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ