
বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীর ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান ধীরে ধীরে কমে যায়। ফলে বয়স বাড়ার পর গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমতে পারে। এই কারণে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে অনেক নারী তুলনামূলক কম বয়সে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে বলা হয় এগ ফ্রিজিং বা Oocyte Cryopreservation।
এ পদ্ধতিতে নারীর ডিম্বাশয় থেকে নিষিক্ত না হওয়া ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। এরপর বিশেষ প্রযুক্তিতে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় সেগুলো হিমায়িত করে সংরক্ষণ করা হয়। ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে সংরক্ষিত ডিম্বাণু গলিয়ে শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত করা হয় এবং তৈরি ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
কারা এগ ফ্রিজিং করতে পারেন?
শুধু বয়সের কারণে নয়, চিকিৎসাগত প্রয়োজনেও এগ ফ্রিজিং করা হতে পারে। ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি শুরু করার আগে কিংবা ডিম্বাশয়ে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে ভবিষ্যৎ প্রজননক্ষমতা ধরে রাখতে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
এ ছাড়া পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত পরিকল্পনা বা উপযুক্ত সঙ্গী না পাওয়ার কারণে যারা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে চান, তারাও ‘সোশ্যাল এগ ফ্রিজিং’-এর কথা বিবেচনা করেন।
কীভাবে করা হয় এগ ফ্রিজিং?
প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডিম্বাশয়ের অবস্থা ও ডিম্বাণুর সম্ভাব্য সংখ্যা মূল্যায়ন করা হয়। এরপর হরমোনের ওষুধ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে একাধিক ডিম্বাণু পরিপক্ব করার চেষ্টা করা হয়।
ডিম্বাণু পরিপক্ব হলে সেডেশন বা অ্যানেসথেশিয়ার মাধ্যমে আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে যোনিপথ দিয়ে সূচ প্রবেশ করিয়ে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। এরপর ভিট্রিফিকেশন প্রযুক্তিতে দ্রুত হিমায়িত করে প্রায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করা হয়।
বাংলাদেশে কত টাকা খরচ হতে পারে?
বাংলাদেশেও কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এগ ফ্রিজিংয়ের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানভেদে খরচের পার্থক্য রয়েছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিম্বাণু সংগ্রহ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। ডিম্বাণু ফ্রিজ করার জন্য এককালীন আরও প্রায় ৫৫ হাজার টাকা এবং সংরক্ষণ চালিয়ে যেতে বছরে প্রায় ২০ হাজার টাকা দিতে হতে পারে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক সংরক্ষণ খরচ ৩০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
এগ ফ্রিজিংয়ের বড় সুবিধা কী?
এর প্রধান সুবিধা হলো ভবিষ্যতের জন্য তুলনামূলক কম বয়সের ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখার সুযোগ পাওয়া। বিশেষ করে এমন নারীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যাদের ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এখনই সন্তান নেওয়া সম্ভব বা ইচ্ছুক নয়।
ক্যান্সারের মতো রোগের চিকিৎসার আগে প্রজননক্ষমতা সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিকল্প হতে পারে।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই কি সন্তান হবে?
এটি মনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে এগ ফ্রিজিং ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। ডিম্বাণু সংগ্রহের সময় বয়স, সংরক্ষিত ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মানসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পরবর্তী সাফল্য নির্ভর করে।
অর্থাৎ, এগ ফ্রিজিংকে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে নয়, বরং প্রজননের একটি সম্ভাবনা সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবে দেখা উচিত।
রয়েছে কিছু ঝুঁকিও
ডিম্বাণু সংগ্রহের আগে হরমোনের ওষুধ ও ইনজেকশন নিতে হয়। এর ফলে কিছু নারীর Ovarian Hyperstimulation Syndrome (OHSS) হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে শরীরে তরল জমা বা রক্ত জমাট বাঁধার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া ডিম্বাণু সংগ্রহের সময় সংক্রমণ, রক্তপাত বা আশপাশের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সামান্য ঝুঁকি রয়েছে। অ্যানেসথেশিয়া বা সেডেশনের ক্ষেত্রেও কিছু জটিলতা হতে পারে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি
এগ ফ্রিজিং আধুনিক প্রজনন চিকিৎসায় ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলেও এটি সবার জন্য একইভাবে কার্যকর নয়। বয়স, স্বাস্থ্য, ডিম্বাশয়ের অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সম্ভাব্য খরচ এবং চিকিৎসার ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্যের অভিজ্ঞতা দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে একজন যোগ্য ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি