
ইতালির মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসরে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশের সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের পরিচালনায় নির্মিত সিনেমাটি উৎসবের সম্মানজনক ‘অরিজোন্তি’ প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে ভেনিস উৎসবের এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে সিনেমাটি।
গত ২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ১২ দিনব্যাপী উৎসবের মূল ভেন্যু পালাৎসো দেল সিনেমার সালা ক্যাসিনো থিয়েটারে গত শনিবার সন্ধ্যায় ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন রোববার সালা দারসেনা থিয়েটারে হয় সিনেমাটির দ্বিতীয় প্রদর্শনী। স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলেও অ্যাস্ট্রা-১ ও অ্যাস্ট্রা-২ থিয়েটারে ছবিটির প্রদর্শনীর কথা রয়েছে।
শৈশবের স্মৃতি থেকে সিনেমার গল্প
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর গল্পের ভাবনা এসেছে পরিচালকের শৈশবের কিছু স্মৃতি থেকে। প্রায় দুই দশক ধরে একটি গল্প ও অভিজ্ঞতা রুবাইয়াত হোসেনকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ছোটবেলায় একটি বিউটি পার্লারে শোনা গল্প এবং সেই সময়ের কিছু ভয় ও অনুভূতি থেকেই সিনেমাটির মূল ভাবনার জন্ম।
ঢাকার একটি বিউটি পার্লার, একটি বিয়েবাড়ি এবং শৈশবের ভয়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে সিনেমাটির গল্প। ফলে ব্যক্তিগত স্মৃতি, সামাজিক বাস্তবতা ও ভয়ের আবহ একসঙ্গে মিলিয়ে ভিন্নধর্মী একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে।
সিনেমার নির্মাণে নারীদের আধিপত্য
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর অন্যতম বিশেষ দিক এর নারীনির্ভর নির্মাণদল। আবহসংগীত ছাড়া চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, প্রোডাকশন ডিজাইনসহ চলচ্চিত্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের নেতৃত্বে ছিলেন নারীরা।
পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের মতে, নারী টেকনিশিয়ানদের দক্ষতা ও কাজের গতি তাকে মুগ্ধ করেছে। একই সঙ্গে নারীরা ভালো সিনেমা নির্মাণ করতে পারেন না—এমন প্রচলিত ধারণা ভাঙার ক্ষেত্রেও এই সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী
সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন নতুন মুখ জাইনীন চৌধুরী করিম। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে রিকিতা নন্দিনী শিমু ও সুনেরাহ বিনতে কামালকে। অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান।
নতুন ও পরিচিত অভিনয়শিল্পীদের সমন্বয়ে নির্মিত এই সিনেমাটি আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে বাংলাদেশের সমকালীন চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
পাঁচ দেশের যৌথ প্রযোজনা
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নির্মিত হয়েছে ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে, জার্মানি এবং বাংলাদেশের খনা টকিজের যৌথ প্রযোজনায়। আন্তর্জাতিক প্রযোজনার এই কাঠামো সিনেমাটিকে দেশের গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
ভেনিস উৎসবের পর চলতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সিনেমাটির প্রদর্শনী হওয়ার কথা রয়েছে। আর বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য ছবিটি আগামী বছর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন মাইলফলক
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক যাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। বিশেষ করে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে ‘অরিজোন্তি’ প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হওয়া দেশের নির্মাতা ও চলচ্চিত্রকর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে জন্ম নেওয়া গল্প আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বড় মঞ্চে পৌঁছানো—‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর এই যাত্রা বাংলাদেশের সিনেমার জন্য নিঃসন্দেহে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি