
হরমুজ প্রণালিতে সৌদি আরবের মালিকানাধীন একটি জ্বালানি তেলবাহী সুপার ট্যাংকারে হামলার অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় জাহাজে থাকা ফিলিপাইনের দুই নাবিক নিহত হয়েছেন।
সৌদি আরবের জাতীয় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান বাহরি জানিয়েছে, তাদের ‘সিদর’ নামের জাহাজটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি নিরাপত্তাজনিত ঘটনায় আক্রান্ত হয়। স্থানীয় সময় সোমবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ঘটনাটি ঘটে বলে প্রতিষ্ঠানটির বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ‘সিদর’ তখন ওমানের মুসানদাম উপদ্বীপের উত্তরে অবস্থান করছিল। ওই সময় জাহাজটিতে কয়েকটি অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানে। হামলার পর জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং পরে দুই নাবিকের মৃত্যুর খবর সামনে আসে।
সৌদি আরব সরাসরি এই ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগটির কোনো জবাব দেয়নি। তবে এর আগে ইরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে দুটি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে আগুনের কবলে পড়েছে। ইরানের দাবি ছিল, ওই ট্যাংকার দুটি প্রণালিতে ‘অনুমোদনহীন’ পথে চলাচল করছিল।
একই সময়ে মুসানদাম উপদ্বীপের পূর্বাঞ্চলে দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন আরেকটি জ্বালানি তেলবাহী সুপার ট্যাংকার ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’ আক্রান্ত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথে একাধিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরবের ট্যাংকারে দুই নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে কোনো ধরনের বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি মূল্যে তার প্রভাব পড়তে পারে।
ঘটনার পর সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হরমুজ প্রণালিতে তাদের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের হামলারও নিন্দা জানানো হয়েছে।
সৌদি আরব উত্তেজনা কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে দেশটি।
অন্যদিকে ইরানে চলমান মার্কিন হামলায় হতাহতের ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটিতে ১৮ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক কাউন্টিতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে বাড়িতে হামলায় শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ৬৩ জন আহত হওয়ার ঘটনাকে তেহরান যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ওই ঘটনার বিষয়ে পাওয়া প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা ও দুই নাবিকের মৃত্যু উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত—এই তিনটি বিষয় এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।