
ভয়াবহ বন্যায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে নেপালের বিভিন্ন এলাকায়। উত্তাল নদী পারাপারের জন্য এখন স্থানীয়দের ভরসা হয়ে উঠেছে অস্থায়ী জিপলাইন।
বুধবার নেপালের নুওয়াকোট জেলার বিদুর এলাকায় ত্রিশুলি নদীর ওপর এই অস্থায়ী জিপলাইন স্থাপন করা হয়। নেপাল সেনাবাহিনী প্রায় ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি কেবল বসিয়েছে। সেই কেবলের মাধ্যমে একে একে নদীর দুই পাড়ে মানুষকে পার করে দেওয়া হচ্ছে।
উত্তাল নদীর দুই পাড়ে প্রতিদিনই জড়ো হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। সেনাসদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা কেবল টেনে মানুষকে নিরাপদে নদী পার হতে সহযোগিতা করছেন। বন্যায় আটকে পড়া মানুষ শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার জন্য নয়, জরুরি চিকিৎসা, ওষুধ, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের জন্যও এই জিপলাইন ব্যবহার করছেন।
৪৪ বছর বয়সী সুজনের গল্পও এই দুর্যোগের ভয়াবহতা তুলে ধরে। বন্যায় তাঁর নিজের বাড়ি ভেসে গেছে। পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। হেলিকপ্টারে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় স্ত্রী, দুই সন্তান ও বৃদ্ধ মায়ের কাছে পৌঁছাতে তিনি জিপলাইনের মাধ্যমে উত্তাল ত্রিশুলি নদী পার হন। তিনি আমস্টারডামে শেফ হিসেবে কাজ করেন।
একইভাবে ৩১ বছর বয়সী দেবী মাজি তাঁর তিন বছরের সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে জিপলাইনে নদী পার হয়েছেন। ত্রিশুলি এলাকায় আটকা পড়ার পর স্বামী ও অন্য দুই সন্তানের কাছে নিজের গ্রামে ফিরতে চাচ্ছিলেন তিনি। স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অস্থায়ী এই কেবলই হয়ে ওঠে তাঁর যাত্রার একমাত্র উপায়।
জিপলাইনটি শুধু যাত্রী পারাপারেই নয়, জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ৪০ বছর বয়সী ভীষ্ম ভাট্টারের মা তুলকুমারীর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে পরিবারে থাকা অক্সিজেনও শেষ হয়ে যায়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও নদী পারাপারের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ছিল না। শেষ পর্যন্ত জিপলাইনের মাধ্যমে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুর্যোগে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
উদ্ধারকারীরা এখনো নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্গত ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে খাবার, ওষুধ ও অস্থায়ী আশ্রয়ের সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বন্যার পানিতে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নেপাল সেনাবাহিনীর অস্থায়ী কেবল সংযোগ স্থানীয়দের জন্য জরুরি যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ত্রিশুলি নদীর বিভিন্ন অংশে এ ধরনের আরও পাঁচটি অস্থায়ী কেবল সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষের চলাচল এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছানোর কাজ কিছুটা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেলে কীভাবে স্থানীয় উদ্যোগ ও সামরিক সহায়তায় বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করা যায়, ত্রিশুলি নদীর এই অস্থায়ী জিপলাইন তারই এক নজির হয়ে উঠেছে।