বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
৮ মাসে পেরিয়ে গেলেও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া জায় নেই      বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ       একাদশের শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল আরও ৮ জনের      শরণখোলায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির বিক্ষোভ      রৌমারীতে উপজেলা কাব ক্যাম্পুরীর উদ্বোধন      কপোতাক্ষে মিলল ভ্যানচালক ইখলাসের মরদেহ      টাঙ্গাইল সেতুর প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ      মিছিলের চেষ্টা, ছাত্রলীগের ২০ নেতাকর্মী আটক      এনসিপি নেতাদের গণধোলাই দিতে হবে: এমদাদ চৌধুরী      ৬৮ লাখ টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করেছে বিজিবি      ৪২ বোতল বিদেশি মদসহ আটক ৩      
পেশার মর্যাদা রক্ষা করা আবশ্যক
এম মিরাজ এইচ
প্রকাশ: শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৫, ৬:২২ পিএম আপডেট: ০১.১১.২০২৫ ৬:৩৩ PM

দেশের সম্মানিত শিক্ষকদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া ভাতা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। খবরটা বেশ ইতিবাচক। অনেকেই এটাকে দেখছেন যৌক্তিক আন্দোলনের দারুণ এক সাফল্য হিসেবে। এহেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ধন্যবাদ ও প্রশংসা পাবার যোগ্য। তবে একটা সভ্য জাতি হিসেবে একইসঙ্গে এটা আমাদের জন্য যথেষ্ট লজ্জারও বটে। কেননা, মানুষ গড়ার কারিগরদের ন্যুনতম অধিকার আদায়ের জন্য তাদেরকে কেন রাজপথে নেমে আন্দোলন করতে হবে! কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের দাবিদার একটা দেশের জনবান্ধব ও শিক্ষাবান্ধব সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শিক্ষকদের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তবতা হলো–দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষকগণের বেতন ভাতা ও সুযোগ সুবিধা প্রদানের বেলায় বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্নে–যদিও উল্লেখিত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি একেবারে তলানিতে নয়। তবুও দেরিতে হলেও শিক্ষকদের যৌক্তিক মেনে তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে কিছুটা অবদান রাখার মানসিকতা প্রদর্শন বেশ স্বস্তিদায়ক। আমরা আশা করবো, অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষকদের আনুষঙ্গিক সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। 

কেউ যদি কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে চায় তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবে তাকে উক্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর সঠিক পথ জেনে সেদিকেই অগ্রসর হতে হবে। অন্যথায় সে বিপথগামী হবে। ঠিক একই যুক্তিতে উন্নত বিশ্বের মতো সামগ্রিক অবকাঠামো তৈরি করতে হলে আমাদেরকেও তাদের প্রদর্শিত পথই অনুসরণ করতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে, বিশ্বের যেকোনো উন্নত দেশে শিক্ষকগণের মূল্যায়ন সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। কেননা, দেশ গড়ার কারিগরদের কারিগর শিক্ষক সমাজকে উপেক্ষিত ও অবহেলিত অবস্থায় রেখে একটা সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন কখনো বাস্তবসম্মতই নয়–বাস্তবায়ন তো অনেক দূরের ব্যাপার। 

সেজন্য নিজে একজন শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত শিক্ষকগণের উত্থাপিত দাবিদাওয়ার সঙ্গে আমি অবশ্যই একাত্মতা পোষণ করি। অর্থাৎ শিক্ষকগণের সকল যৌক্তিক দাবির প্রতি আমার রয়েছে পূর্ণ সমর্থন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক শিক্ষক আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত দাবি আদায়ের প্রেক্ষিতে আমি একটা বিষয়ের অবতারণা করতে চাই। বিষয়টি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করি আমি।সেটা হলো–শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুবিধাভোগীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে পরিপূর্ণ সচেতনতা অবলম্বন করা আবশ্যক। কেননা, আমরা দাবি আদায়ের ব্যাপারে সোচ্চার হবো কিন্তু দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দিবো–এটা কিন্তু কাম্য নয়।

সাধারণত শিক্ষকতা পেশাকে অভিহিত করা হয় একটা মহান পেশা হিসেবে। সেক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, অন্যান্য পেশা কি তাহলে মহান নয় কিংবা অন্যান্য পেশার মহত্ত্বের মাত্রা কি কিছুটা কম? যেহেতু সব পেশার বেলায় ঢালাওভাবে মহান শব্দটা ব্যবহৃত হয় না তাহলে ঠিক কোন কারণে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে অতিরিক্ত ‘মহান’ কথাটা জুড়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়লো! যেমন আমরা জানি, শিক্ষা বা শিক্ষিত মানেই কিন্তু সুশিক্ষা বা সুশিক্ষিত।অর্থাৎ অতিরিক্ত ‘সু’ উপসর্গ যুক্ত না করেই সবাই এগুলোর ইতিবাচক দিক সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত হতে পারে। অপরদিকে নেতিবাচক কিংবা উল্টো অর্থ বুঝাতে চাইলে ‘কু’ বা ‘অ’ জাতীয় উপসর্গ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। যেমন কুশিক্ষা বা অশিক্ষিত। একইভাবে ‘ছেলেটা মানুষ হয়েছে’ কথার দ্বারা আমরা বুঝি সে একজন ভালো মানুষ হয়েছে। বিপরীতে খারাপ অর্থে বুঝাতে হলে অতিরিক্ত একটা ‘অ’ উপসর্গ যুক্ত করে বলতে হয়,সে একজন অমানুষ হয়েছে। সেই বিবেচনায় মহান শব্দ ব্যবহার ছাড়াই শিক্ষকতাকে নিঃসন্দেহে মহান হিসেবেই গ্রহণ করা যায়। তথাপি শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মহান বিশেষণ যুক্ত করায় সেটার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব গোটা শিক্ষক সমাজকে অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে ধারণ করতে হবে। কোনোভাবেই যেন সম্মানের এই জায়গাটা ভূলুণ্ঠিত না হয় সেব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। 

একটু পিছনে ফিরে তাকালে আরও স্পষ্টভাবে বোধগম্য হবে, কেন শিক্ষকতা পেশাকে বিশেষভাবে মহান অভিধায় অভিহিত করা হয় এবং অন্যান্য অধিকাংশ পেশা থেকে একটু আলাদা করে হাইলাইট করা হয়। এক্ষেত্রে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, অন্যান্য যেকোনো পেশার তুলনায় শিক্ষকতা পেশায় স্যাক্রিফাইস ও ডেডিকেইশন তুলনামূলক একটু বেশি। অতীতে শিক্ষকগণ ত্যাগের মানসিকতা নিয়েই এই পেশায় প্রবেশ করতেন। এই পেশায় আর্থিকভাবে কতোটুকু স্বচ্ছল হতে পারবেন কি পারবেন না সেদিকে অতোটা জোর দিতেন না তারা। পণ্ডিত মশাইয়ের তিন ঠ্যাংওয়ালা কুকুরের গল্প জানার পরেও অনেক শিক্ষক আর্থিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার প্রতি খুব বেশি ভ্রূক্ষেপ করেননি। আমাদের সময় অধিকাংশ শিক্ষককে দেখেছি, মাসের পর মাস শিক্ষার্থী পড়িয়ে গেছেন। কিন্তু কখনো টাকা চেয়ে নেননি। যে শিক্ষার্থী যখন যতোটা পেরেছে সেটাই দিয়েছে। এমনকি অনেক শিক্ষক গরীব শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে কোনো টাকাই নেননি-ফ্রি পড়িয়েছেন। একইভাবে সমসাময়িক কোনো ডাক্তার রোগী দেখার জন্য চেম্বারের দরোজায় অতিরিক্ত মাত্রায় ভিজিট ফি নির্ধারণ করে মিনি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেননি। ভিজিট দিয়ে ডাক্তার দেখানোর পরে একই ডাক্তারের নিকট রিপোর্ট দেখাতে গিয়ে আবার টাকা গুণতে হয়নি। অনেক ডাক্তার অসচ্ছল রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছেন। মূলত এভাবেই শিক্ষকতা ও ডাক্তারির মতো পেশাগুলো বিশেষভাবে মহান তকমা অর্জন করেছে। আর আজ সেই সব মহানুভবতাকে পুঁজি করে শুরু হয়ে গেছে পুরোদস্তুর ব্যবসা। পূর্বেকার সেই আদর্শ, আন্তরিকতা আর ত্যাগ আজ অনেক অংশে অনুপস্থিত। ভয়ঙ্কর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জনজীবন। এহেন বিপর্যস্ত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে তথা আমাদের যাপিত পেশার সম্মান ও মাহাত্ম্য পুনরুদ্ধারের জন্য সকলকে একযোগে এগিয়ে আসা দরকার। 

শুধু শিক্ষকতা নয়, বরং বিশ্ব পরিমণ্ডলের সকল পেশাই মহান। প্রত্যেকটি পেশার সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে মহান শব্দ ব্যবহৃত হোক বা না হোক, সকল পেশার প্রতি সম্মান বজায় রাখাও মূলত স্বীয় পেশাদারিত্বের অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি প্রভৃতিসহ যেকোনো অপেশাদার কর্মকাণ্ডকে পেশার সংজ্ঞায় আখ্যায়িত কিংবা অন্তর্ভুক্ত করার আসলে কোনো সুযোগ কিন্তু নেই। যাহোক,শিক্ষকতার মতো ডাক্তারি পেশাকেও যেহেতু মহান পেশা হিসেবে অ্যাড্রেস করা হয়, তাহলে ইঞ্জিনিয়ারিং, ওকালতি, ব্যাংকিং, সাংবাদিকতা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরি, ব্যবসা, কুটিরশিল্প প্রভৃতি পেশার সঙ্গে আলাদাভাবে মহান শব্দ জুড়ে দেওয়া হয় না কেন? অন্যান্য আরও যেসব পেশা আছে যেমন–কেরানিগিরি, মেথরগিরি, ঝাড়ুদারি, রিক্সা চালানো, কুলিগিরি, মজুর খাটা বা কামলাগিরি এসব পেশার সঙ্গে মহান শব্দ ব্যবহারেই বা আপত্তি কোথায়? কোনো কাজই ছোটো নয়–এজাতীয় পাঠ তো আমাদের শিক্ষকমণ্ডলীই তাদের শিক্ষার্থীদের শেখান। সুতরাং এখন সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর–উপলদ্ধি শুদ্ধিকরণ ও পুনর্গঠনের আর পুরনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে এসে প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ দৃঢ় করার। 

দেখা যায়, একজন ঝাড়ুদার, দিনমজুর বা মাটিকাটা কামলাকাজে ফাঁকি দেন না কিংবা মজুরি বা বেতনের বাইরে অতিরিক্ত পাওনা দাবি করেন না। বরং তারা যথেষ্ট সুচারুরূপে তাঁদের দায়িত্ব পালন করে যান। অপরদিকে শিক্ষক নামধারী হয়েও একটা বড়সড় গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানের ক্লাসে যথেষ্ট অ্যাক্টিভ হওয়া ও যথাযথ আন্তরিকতা প্রদর্শনে চরম উদাসীনতার পরিচয় দেন। তারা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসের বাইরে প্রাইভেট ব্যাচে পড়ানোতে বেশি প্রাধান্য ও মনোযোগ দিয়ে থাকেন। একজন শিক্ষক যদি ক্লাসে পড়ানোর চাইতে প্রাইভেট পড়ানোতে অধিক মনোযোগী হন তাহলে তিনি তো শিক্ষক হয়েও শিক্ষকতা পেশাকে কলংকিত করলেন। এমন শিক্ষকও আছেন যিনি একটা ক্লাসের যেসমস্ত শিক্ষার্থী তার নিকট প্রাইভেট পড়ে তাদেরকে বেশি আন্তরিকতা দেখান আর যারা তার নিকট পড়ে না তাদের প্রতি তির্যক দৃষ্টি দেন। এজাতীয় শিক্ষকের সংখ্যা কিন্তু নেহায়েত কমও নয়।অন্যান্য বেশিরভাগ পেশার ক্ষেত্রেও অবশ্য এমন চিত্রই সচরাচর পরিলক্ষিত হয়। যেমন অধিকাংশ ডাক্তার সরকারি হাসপাতালের চাইতে প্রাইভেট চেম্বারে প্র্যাকটিসের দিকে বেশি মনোনিবেশ করেন। অর্থাৎ তথাকথিত যতো বেশি শিক্ষিতের পেশা ততো বেশি কাজে অসততা ও ফাঁকিবাজির আধিক্য। তাহলে শিক্ষার সঙ্গে এর চাইতে বড় মস্করা বা তামাশা আর কী হতে পারে? তাই এরূপ অবস্থার অবসান হওয়া অত্যন্ত জরুরি। 

কী প্রাপ্য ছিল আর কী পেলাম না এসব নিয়ে অনেক কথা হয়, দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য মানববন্ধনের আয়োজন হয়, ধর্মঘট ডাকা হয়, কর্মবিরতি পালন করা হয়। অথচ আজ পর্যন্ত কারও দায়িত্বে অবহেলা নিয়ে কখনো বড়ো পরিসরে কাউকে সরব হতে দেখা গেল না। যদিওশিক্ষকতার মতো এতো দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ও জবাবদিহিতা মূলক থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেটা না হয়ে অধিকাংশ শিক্ষকদের বিবেক যেন কেবল পাওয়া না পাওয়ার হিসাবেই পুরোপুরি আটকে আছে! যাহোক, মহান পেশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখার দায়িত্ব মূলত উক্ত পেশাজীবীদের উপরেই বর্তায়। 

এদেশে সম্মানিত শিক্ষিকগণ বেশ অবহেলিত এটা যেমন ঠিক, একইসঙ্গে আমি এমন অনেক শিক্ষকের কথা জানি, যারা এতোটাই স্বচ্ছল যে, বছরের পর বছর তাঁদের মাসিক বেতন তোলার দরকার পড়ে না। বাড়ি গাড়িও করেছেন। এহেন অবস্থা সত্ত্বেও এমন শিক্ষকগণও ক্লাসরুমে পড়ানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদাসীনতার পরিচয় দেন। তাদের সব ধ্যানজ্ঞান যেন প্রাইভেট ব্যাচ পড়ানোর মাধ্যমে কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জনের ধান্দায় সীমাবদ্ধ। কার্যকর গবেষণার কথা না হয় না-ই বললাম। অবশ্য নামমাত্র কিছু গবেষণা কর্মের যতোটুকু ফিরিস্তি মাঝে মাঝে পাওয়া যায় সেখানেও হরহামেশা উঠে আসে কিছু মহান (?) শিক্ষকের নির্লজ্জ চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ। আবার দেখা যায়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাসে মাসে বেতন ঠিকই নিচ্ছেন অথচ বেশিরভাগ সময় ব্যয় করছেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ক্ষেত্রে। সরকারি কিংবা বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীই এদেশের সম্পদ। কিন্তু শিক্ষার মতো এমন একটা মৌলিক বিষয়ের ক্ষেত্রে কেউ বেশি পয়সা দিতে পারলে ভালো শিক্ষা পাবে আর কেউ সেই পরিমাণ পয়সা দিতে না পারলে অনুরূপ ভালো শিক্ষা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে এটা আসলে মেনে নেওয়া যায় না। অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে তথা দ্রুতই এরকম বৈষম্যের পরিসমাপ্তি টানা দরকার। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনে প্রত্যেক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। কেননা, এরকম বৈষম্য চলতে থাকলে রাষ্ট্র নামক দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান একপ্রকার অকার্যকর হয়ে পড়ে যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। 

কিছুদিন আগে আমার ইউনিভার্সিটির এক সিনিয়র ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। ড্রয়িংরুমে বসে কথাবার্তা বলার এক পর্যায়ে সেই বড়ভাই বেশ আক্ষেপের সুরে প্রসঙ্গক্রমে একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন। তিনি বললেন-মিরাজ, আমাদের কলেজের শিক্ষক লাউঞ্জে বসতে আমার খুব আনইজি ফিল হয়। কেননা, প্রায় সব শিক্ষকের গল্পের একটাই কমন টপিক--কার কয়টা প্লট হলো, কে কতোটুকু জায়গা-জমি কিনলেন, কে কোথা থেকে শপিং করেন, কার বাসায় কোন ব্র্যান্ডের ফার্নিচারও অন্যান্য আসবাব ইত্যাদি। অর্থাৎ কার সম্পদ কত দাঁড়ালো ও লাইফস্টাইল কেমন এগুলোই তাঁদের প্রধান আলোচ্য বিষয়। আমি যেহেতু ইংরেজি শিক্ষক হয়েও কলেজে শিক্ষকতার বাইরে প্রাইভেটে কোনো স্টুডেন্ট পড়াই না তাই তাদের গল্পের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই তাল মেলাতে পারিনা। তাদের মাঝে আমি হয়ে পড়ি বড্ড বেমানান! এটা অনেকটা আগাছার আধিক্যে বৃক্ষের বিলীন হওয়ার মতো অবস্থা।সুতরাং শিক্ষক পরিচয়কে মহিমান্বিতকরণের মাধ্যমে তাঁদের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কুশিক্ষক নামক আগাছা পরিস্কারের মিশন পরিচালনা করা এই মুহূর্তে অন্যতম অগ্রাধিকারের দাবি রাখে। 

আরেকবার আমার একজন কলেজ শিক্ষক তার এক ডাক্তার বন্ধুর অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন। স্যারের সেই বন্ধু যথেষ্ট সৎ ও মানবিক হওয়ায় বেশ অনুযোগের সুরে বলেছিলেন- মেডিকেল রেপ্রিজেন্টেটিভদের উপর্যুপরি ভিজিটে আর নানান অফারে আমি আসলে অতিষ্ঠ। প্রত্যেক কোম্পানিরই একই কথা, তাদেরটাই সেরা। সেরা তো সেরাই। সব সেরারাই আবার বিভিন্ন রকম লোভনীয় অফারের মাধ্যমে এমনভাবে জেঁকে ধরে যেন আমি বাধ্যতামূলকভাবে তাদের প্রোডাক্টই চালিয়ে দিই। একইভাবে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের যোগসাজশে নির্দিষ্ট গাইড বই শিক্ষার্থীদের মাঝে চালিয়ে দেওয়ার দারুণ এক প্রবণতা ও সাদৃশ্য বিদ্যমান। হায়রে আমার দেশ ও সমাজ! এটাও নাকি ব্যবসার ধরন! এটা তো রীতিমতো এক ধরনের জিম্মি করার মাধ্যমে টাকা উপার্জন। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলো যখন নির্বিকার থাকেন তখন সমাধানের পথ আর অবশিষ্ট থাকে না।অর্থাৎ হয়রানি রোধকল্পে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না হলে সংকট আরও গভীরতর হয়।একটা দেশের সেবাব্রতী ডাক্তার সমাজ ও শিক্ষক সমাজ যখন সেবার নামে বিভিন্ন অজুহাতে মানুষকে আর্থিক হয়রানির দিকে ঠেলে দেন তখন সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা অনেক সংকীর্ণ ও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়–নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানো যাবে না মর্মে সরকারি নির্দেশনা কেবলই কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ এখন। বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে অধিকাংশ ডাক্তারের অলিখিত কমিশন চুক্তির ব্যাপারে প্রায় কেউই টুঁশব্দও করে না। এজাতীয় সকল ওপেন সিক্রেট অনাচারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন তাই সময়ের অপরিহার্য দাবি। 

পরিশেষে বলতে চাই, একটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হয়, সেটার দাবিদাওয়া পুরোপুরি মেনে নেওয়া সম্ভব না হলেও কিছু কিছু তো ঠিকই মানা হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এতো কিছু সেই শিক্ষাদানের মান ও আন্তরিকতায় কতোটুকু উন্নতি হয়? অবশ্য অগ্রগতি যে মোটেও হয় না এমনও নয়। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যতোটুকু সমৃদ্ধি হওয়ার কথা প্রত্যাশিত লেভেল থেকে বেশ খানিকটা দূরেই থাকে তার অবস্থান। মনে রাখা চাই, আজকের শিক্ষার্থী আগামীর শিক্ষক, বর্তমানের আন্দোলনকারী অ্যাক্টিভিস্ট আগামীদিনে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত প্রতাপশালী নেতা বা প্রশাসক। এই ধ্রুব সত্য মাথায় রেখে যার যার অবস্থান থেকে আমরা সবাই যদি যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারি তাহলে আমাদের দেশটা হয়ে উঠতে পারে একটা উন্নত, উদার, মানবতাবাদী, সাম্য ও ন্যায়ের প্রতীক'-বিশ্বের বুকে এক অনুসরণীয় মডেল বা দৃষ্টান্ত। সুতরাং আর নয় দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অগ্রহণযোগ্য অজুহাতের দোহাই। 
বরং নিজ নিজ পেশার মর্যাদা সমুন্নত রাখার মান সে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে স্বীয় কর্ম সম্পাদনকে প্রাধান্য প্রদান পূর্বক সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে মানবিক সমাজ গঠনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার দৃঢ় শপথ আজ উচ্চারিত হোক এদেশের লাখো কণ্ঠে।


লেখকঃ শিক্ষক (প্রতিষ্ঠাতা, ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা)


স্বদেশ প্রতিদিন/এমএস

আরও সংবাদ   বিষয়:  পেশা   মর্যাদা   শিক্ষক  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close