
সোনারগাঁওয়ে শিল্প-কারখানায় পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পায়নের গতি
সোনারগাঁও বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি ঐতিহাসিক উপজেলা, যা একসময় ছিল বাংলার প্রাচীন রাজধানী। এখন একে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম শিল্প ও পর্যটননির্ভর অর্থনীতি। একদিকে পানাম নগর, লোকজ জাদুঘর, বাংলার তাজমহল ও মেঘনা নদীর সৌন্দর্য পর্যটক টানছে; অন্যদিকে শিল্প-কারখানার বিস্তার বদলে দিচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতির চেহারা।
বর্তমানে সোনারগাঁওয়ের মোগরাপাড়া, কাচপুর, বারদী, সোনারগাঁও শিল্পাঞ্চল ও মেঘনা শিল্পনগর এলাকাজুড়ে এখন গড়ে উঠেছে প্রায় ৪৫০টির বেশি বড় ও মাঝারি শিল্প-কারখানা। এখানে রয়েছে তৈরি পোশাক, ওষুধ, প্লাস্টিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং শিল্প। কাচপুর ও মেঘনা এলাকায় এখন দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর কারখানা ও ডিপো স্থাপিত হয়েছে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বেড়েছে কয়েকগুণ।
শিল্পায়নের পাশাপাশি সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, নকশিকাঁথা, বাঁশ-বেতের কাজ এবং কাঠের খোদাই শিল্পও এখনও টিকে আছে। বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় শিল্পীরা প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে নিজস্ব পণ্য বিক্রি করেন। এতে নারীদের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। স্থানীয় কারুশিল্পী কাম নুরনাহার সুমি বলেন, আগে শুধু হাটে বিক্রি করতাম, এখন জাদুঘর এলাকায় পর্যটকরাই আমাদের পণ্য কিনে নিয়ে যান।
শিল্প ও পর্যটনের যুগপৎ বিকাশে বদলে গেছে এখানকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপট। এক সময় কৃষি ও জেলেপেশাই ছিল স্থানীয় জীবিকার মূল ভরসা, এখন যুক্ত হয়েছে কারখানা, ব্যবসা ও সেবা খাত। স্থানীয় রেস্তোরাঁ, হোটেল, ফটোগ্রাফি সার্ভিস, টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে রাইডশেয়ার পর্যন্ত সবখানেই তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
এদিকে মেঘনা নদীর চরাঞ্চলে নৌভ্রমণ ও পর্যটনসেবা কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে নদী অর্থনীতি। চরভূমিতে মাছধরা, ফলমূল চাষ ও নৌকা পরিবহন এখন বড় আয়ের উৎস। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকদের আগমনে নদীপাড়ের ব্যবসা জমজমাট থাকে।
তবে দ্রুত শিল্পায়ন ও পর্যটন বৃদ্ধির ফলে কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, নদীর দূষণ, ট্রাফিক সমস্যা এবং প্রত্নস্থানের সংরক্ষণ; এসব বিষয়ে সচেতনতা ও পরিকল্পনা না থাকলে ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়তে পারে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন।
সোনারগাঁও উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সরকার এখানে পর্যটন ও শিল্পের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। পানাম নগর ও লোকজ জাদুঘরের সংরক্ষণ, রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের কাজ চলমান রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, আগে সোনারগাঁও শুধু ইতিহাসের জায়গা ছিল, এখন এখানে কাজও আছে, ব্যবসাও আছে। পর্যটন আর শিল্প—দুই দিক থেকেই আমাদের জীবন বদলে গেছে।
ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ও নদী সব মিলিয়ে সোনারগাঁও এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অঞ্চল। যেখানে প্রাচীন ঐতিহ্যের পাশে আধুনিক শিল্পকারখানার ধোঁয়া উঠছে, আর তার মাঝেই তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থানের গল্প। সোনারগাঁও এখন শুধু বাংলার গৌরব নয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীকও।