
ছবি: রয়টারর্স
চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনায় নতুন মোড় এনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুর্বল জায়গায় আঘাত হেনেছে। দেশটি নিজেদের দুর্লভ খনিজ রফতানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, যা বিশ্ববাজারে চীনের প্রভাব আরও শক্তিশালী করছে।
গত সপ্তাহে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছে ‘২০২৫ সালের ৬২ নম্বর ঘোষণা’, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, যে কোনও বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি এমন কোনো পণ্য রফতানি করতে চায় যাতে সামান্য পরিমাণও দুর্লভ খনিজ থাকে, তাদের চীনা সরকারের অনুমোদন নিতে হবে এবং পণ্যের ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য জানাতে হবে।
দুর্লভ খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই খনিজগুলো স্মার্টফোন, যুদ্ধবিমান, সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে ৪০০ কেজি বা তার বেশি দুর্লভ খনিজ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটরে ব্যবহৃত চৌম্বক ধাতুর প্রায় ৭০ শতাংশ চীনের সরবরাহে নির্ভরশীল।
এর জবাবে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ আনা হবে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, এটা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য চীনের চ্যালেঞ্জ। তারা সরবরাহ শৃঙ্খল ও শিল্পখাতের ওপর শক্তিশালী প্রভাব দেখাচ্ছে।
অন্যদিকে চীন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, যদি রফতানি লাইসেন্সের আবেদন সঠিক হয় এবং বেসামরিক ব্যবহারের জন্য হয়, তাহলে তা অনুমোদিত হবে।
উভয় দেশ পরস্পরের জাহাজে নতুন বন্দর ফি আরোপ করেছে, যা মে মাসের আপসচুক্তির পর কয়েক মাসের শান্তির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। চলতি মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুর্লভ খনিজ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীন আলোচনায় এগিয়ে গেছে।
অস্ট্রেলিয়ার এডিথ কাওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওইস ম্যাকডোনাহ বলেন, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ শৃঙ্খলকে সরাসরি প্রভাবিত করবে এবং আলোচনার সময়সূচী ব্যাহত করবে। সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক মারিনা ঝাং বলেন, চীন বহু বছর ধরে এই খাতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব গড়ে তুলেছে এবং গবেষণা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক এগিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা বিকল্প উৎস তৈরি করার চেষ্টা করছে, কিন্তু বাস্তবায়নে এখনও সময় লাগবে। অস্ট্রেলিয়াকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখা হলেও তাদের উৎপাদনব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ঝাং বলেন, চীনের সমকক্ষ হতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে।
চীনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান দেখায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দুর্লভ খনিজ রফতানি গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশেরও বেশি কমেছে, তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত, কারণ এই খাতের আকার চীনের ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ০.১ শতাংশেরও কম।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সোফিয়া কালানজাকোস বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষুদ্র হলেও কৌশলগত দিক থেকে দুর্লভ খনিজ চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় চীনের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করছে।
যদিও বেসেন্ট চীনকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছেন, তিনি আলোচনার দরজা খোলা রেখেছেন। একইভাবে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, উভয় পক্ষের উচিত কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন, পার্থক্যগুলো সমাধান করা এবং সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও টেকসই রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে কাজ করছে।
সূত্র: বিবিসি
স্বদেশ প্রতিদিন/শাহো