
প্রতীকী ছবি
জুলাই-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সর্বশেষ রাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। সে সময় প্যানেল হিসেবে ছাত্রদলের একক আধিপত্য দেখা গেলেও এবারের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এককভাবে কাউকে এগিয়ে রাখার সুযোগ নেই বললেই চলে।
এবারের নির্বাচনে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ মিলিয়ে মোট ১১টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর বাইরে রয়েছেন কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীও। রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পর বড় দলগুলোর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ না থাকলেও সংশ্লিষ্ট আদর্শের অনুসারীরা বিভিন্ন নামে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।
ছাত্রশিবির, ছাত্রদল, প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণে এবারের রাকসু নির্বাচনে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাকসুর মোট ২৩টি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৪৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ভিপি পদে ১৮, জিএস পদে ১৩ ও এজিএস পদে ১৬ জন প্রার্থী লড়ছেন। সিনেট প্রতিনিধি পদে রয়েছেন ৫৮ জন প্রার্থী এবং ১৭টি হলে হল সংসদের ৫৯৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
মোট ভোটার সংখ্যা ২৮ হাজার ৯০১ জন, যার মধ্যে নারী ১১ হাজার ৩০৫ এবং পুরুষ ১৭ হাজার ৫৯৬ জন।
নির্বাচনে সবার নজর শীর্ষ তিন পদে- ভিপি, জিএস ও এজিএস। সহ সভাপতি (ভিপি) পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ছাত্রশিবির মনোনীত মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ও ছাত্রদল সমর্থিত শেখ নূর উদ্দীন আবীরের মধ্যে। এছাড়া বাম সমর্থিত ফুয়াদ রাতুল ও ছাত্র অধিকারের মেহেদী মারুফও আলোচনায় আছেন।
সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শিবির সমর্থিত ফাহিম রেজা, ছাত্রদলের নাফিউল ইসলাম জীবন এবং সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দীন আম্মারের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে। এজিএস পদে ছাত্রদলের জাহীন বিশ্বাস এষা ও শিবিরের সালমান সাব্বিরের মধ্যে টানটান প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) সরেজমিনে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে উৎসবের আমেজ। পোস্টার, লিফলেট ও মাইকিংয়ে মুখর শিক্ষার্থীরা।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাসিমুল মুহিত ইফাত বলেন, “দীর্ঘ ৩৫ বছর পর নির্বাচনের আয়োজন আমাদের জন্য আনন্দের। রাজনৈতিক প্যানেলগুলো বিশেষ করে ছাত্রদল ও শিবির এবার শক্ত অবস্থানে আছে, তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও ভালো প্রচারণা চালাচ্ছেন।”
ছাত্রী ফারিহা ইসলাম মিম বলেন, “এটা শুধু ভোট নয়, গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রতীক। জিএস পদে ত্রিমুখী লড়াই হলেও ছাত্রদলের জীবন বড় চমক দিতে পারেন।”
হানজালা সবুজ, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র, বলেন, “স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা আছে। অনেকেই দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে শিক্ষার্থীদের আসল সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, “ছাত্রদল এবার গোছানোভাবে প্রচার চালিয়েছে। তাদের মাঠে উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ভিপি ও এজিএস পদে তারা ভালো করতে পারে।”
ছাত্রী মেহজাবিন সুলতানা বলেন, “শিবির সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট খুব সংগঠিতভাবে প্রচার করেছে। মেয়েদের হলগুলোতেও তাদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে।”
শিক্ষার্থী শামীম আহমেদ বলেন, “দলীয় রাজনীতি থাকলেও শিক্ষার্থীরা এবার সুষ্ঠু পরিবেশ ও কার্যকর প্রতিশ্রুতি আশা করছে। যে প্যানেল তা দিতে পারবে, তারাই শেষ হাসি হাসবে।”
ভোট জালিয়াতি ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে ‘থ্রি ডাইমেনশনাল সিকিউরিটি’ ব্যবস্থা; যেখানে ভোটারদের আইডি যাচাই, ছবি মিলিয়ে দেখা এবং গোপন কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।
ভোটের দিনে নিরাপত্তায় থাকবে দুই হাজার পুলিশ, ছয় প্লাটুন বিজিবি ও বারো প্লাটুন র্যাব। পুরো ক্যাম্পাস থাকবে সিসিটিভি নজরদারিতে। আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, “গুজব প্রতিরোধে সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের টিম যৌথভাবে অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণ করছে।”
উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে রাকসু নির্বাচন বন্ধ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে। অবশেষে ২০২৫ সালে, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় পুনরায় চালু হচ্ছে এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
ভোটগ্রহণ শেষে রাতেই কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তন থেকে ফলাফল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।