
বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর সৌদি আরবের সিংহাসনে বসেন সালমান বিন আবদুল আজিজ। প্রথমে ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ঘোষণা করা হয় মুকরিন বিন আবদুল আজিজকে, কিন্তু মাত্র তিন মাস পরই তাকে সরিয়ে ভাইপো মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ক্রাউন প্রিন্স করা হয়। একই সময়ে বাদশাহ সালমান তার মাত্র ২৯ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী বানান। এর পর থেকেই শুরু হয় এমবিএসের ক্ষমতার উত্থান, যা তাকে আজকের সৌদি রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত করেছে।
বাবাকে নজরে রাখা ও গৃহবন্দি করা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরপরই এমবিএস নিজেকে বাদশাহর “গেটকিপার” বানিয়ে তোলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ধীরে ধীরে বাবাকে তার পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এমনকি তার মা ও দুই বোনকেও গৃহবন্দি করেন, অথচ বাদশাহকে বলা হতো যে তারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে আছেন। বাবার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি ক্ষমতার দখল মজবুত করতে থাকেন।
ইয়েমেন যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করেন এমবিএস। প্রথমদিকে দেশবাসী একে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানালেও অচিরেই এ যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য এক বড় রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক মহল এটিকে এমবিএসের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা বলে সমালোচনা করে।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে অপসারণ
২০১৭ সালে এক নাটকীয় ঘটনায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে পদ থেকে সরিয়ে ক্রাউন প্রিন্স করা হয় এমবিএসকে। বলা হয়, নায়েফকে এক রাতের মধ্যে প্রাসাদে ডেকে এনে তার রক্ষীদের নিরস্ত্র করা হয় এবং ওষুধ না দিয়ে দুর্বল অবস্থায় বাধ্য করা হয় পদত্যাগে। এরপর থেকেই তিনি গৃহবন্দি হয়ে পড়েন এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও বাজেয়াপ্ত হয়।
সংস্কার ও কঠোর শাসন
ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে এমবিএস শুরু করেন একের পর এক সামাজিক সংস্কার। ২০১৮ সালে নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার ও পোশাকের স্বাধীনতা দেন তিনি। তবে সমালোচকদের মতে এগুলো মূলত অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নেওয়া পদক্ষেপ, নারীর স্বাধীনতার জন্য নয়। একই সঙ্গে তিনি ‘শুরা’ বা পারিবারিক পরামর্শ পরিষদের প্রথা ভেঙে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি চালু করেন। সমালোচকদের মতে, সৌদি রাজনীতিতে এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
বিলাসিতা, গ্রেফতার ও হারিরি বিতর্ক
বিলাসিতার জন্যও বিখ্যাত এমবিএস ৫০ কোটি ডলার খরচ করে একটি ইয়ট এবং ৪৫ কোটি ডলার দিয়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির চিত্রকর্ম কিনেছিলেন। অন্যদিকে, দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৭ সালে শতাধিক প্রিন্স ও ব্যবসায়ীকে রিৎজ-কার্লটন হোটেলে আটকে রাখেন তিনি এবং তাদের কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার জরিমানা আদায় করেন। একইভাবে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরিকে সৌদি সফরে এসে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও খাসোগজি হত্যাকাণ্ড
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এমবিএসের শাসনকালে হাজারো মানুষ বিচার ছাড়াই কারাগারে আটক হয়েছেন, সাংবাদিকরা বন্দি হয়েছেন এবং সমালোচনার ওপর কঠোর দমন চালানো হয়েছে। তবে তার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংকট ছিল সাংবাদিক জামাল খাসোগজির হত্যাকাণ্ড। তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে এ হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন এমবিএস নিজেই—এমন প্রমাণ মেলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে। যদিও তিনি সরাসরি দায় অস্বীকার করেন, তবুও দায়ভার নিতে বাধ্য হন সৌদি আরবের নেতা হিসেবে।
ভবিষ্যৎ বাদশাহ
আজ সৌদি আরবজুড়ে মোহাম্মদ বিন সালমানের পোস্টার শোভা পাচ্ছে। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি সৌদি রাজনীতির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন। সমালোচকরা তাকে কঠোর শাসক ও ক্ষমতালোভী হিসেবে দেখলেও তার সমর্থকরা মনে করেন, তিনি সৌদি আরবকে এক নতুন যুগে নিয়ে যাচ্ছেন—যেখানে পুরনো রক্ষণশীল ধারা ভেঙে আধুনিকায়নের দিকে এগোচ্ছে দেশ।
সূত্র: বিবিসি
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ