
সংগৃহীত ছবি
টানা তিন মাস বননির্ভর জেলেদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকার পর পুণরায় খুললো সুন্দরবন। এই তিন মাসে জেলেদের জীবিকা স্থবির হয়ে পড়েছিল। ঋণের বোঝা, সন্তানদের পড়াশোনা খরচ, খাওয়াদাওয়াসহ সবকিছু নিয়েই কষ্টের দিন কাটাতে হয়েছে তাদের।
সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে জেলে, বাওয়ালি ও পর্যটকরা আবারও প্রবেশ করতে পারছেন সুন্দরবনে। শ্যামনগর উপকূলজুড়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের জেলে আহমদ আলী ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। ২০০৯ সালে নৌকায় বাঘের হামলার শিকার হয়েও তিনি আবার জীবিকার পথে ফিরে এসেছেন।
আহমদ আলী বলেন, "তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকায় সংসার চালানো খুব কষ্টের হয়ে গিয়েছে। টাকা-পয়সা ধার করে চলেছি। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনাও থেমে গেছে। দোকানদারের কাছে ঋণও হয়েছে। এখন বন খুলে দেওয়ায় আশা ফিরেছে। আশা করি এবার ভালো মাছ ও কাঁকড়া ধরতে পারব, ঋণ শোধ করতে পারব এবং সংসার চালাতে পারব।"
তিনি আরও জানান, বন্ধকালীন সময়ে কিছু জেলেরা নিষিদ্ধভাবে বনে প্রবেশ করে বিষ দিয়ে মাছ ও কাঁকড়া ধরেছে। এতে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমরা বৈধভাবে প্রবেশ করি, কিন্তু অন্যদের অবৈধ কার্যকলাপ আমাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে।
আহমদ আলী সপ্তাহে কাঁকড়া ধরার জন্য ৮০০ টাকা, মাছ ধরার জন্য ১ হাজার টাকা ফি দিয়ে পাস নেন। তিনি বলেন, “আমাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষ ঋণের বোঝা নিয়ে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। এবার প্রাপ্ত মাছ-কাঁকড়া আমাদের ঋণ শোধের পথ খুলবে।”
একই এলাকার মিজানুর রহমান বলেন, “তিন মাস পাস বন্ধ থাকায় আমরা সন্তানদের পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া সবকিছু চালাতে হিমশিম খেয়েছি। দোকানদার ও বন্ধুবান্ধবের কাছে ধার করেছি। আজ পাস হাতে পেয়েছি, খুশি মনে সুন্দরবনে যাচ্ছি মাছ ধরতে।”
রফিকুল ইসলাম জানান, আমাদের জীবন সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই তিন মাস পাস বন্ধ ছিল। আজ আবার পাস পেয়েছি, তাই বৈধ পথে মাছ ধরতে যাচ্ছি। তবে ভয়ও আছে, জলদস্যুদের অত্যাচার এখনও আছে। সরকার যদি নিরাপত্তায় আরও খেয়াল রাখতো, আমরা আরও নিরাপদে কাজ করতে পারতাম।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. ফজলুল হক জানান, প্রজনন মৌসুমে বন বন্ধ রাখা হয় যাতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়। এখন জেলেরা বৈধ পাস নিয়ে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারবেন। বন, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও রিভার পুলিশ যৌথভাবে তদারকি করছে।
এদিকে ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ সমস্যা হলে সরাসরি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন।
শ্যামনগর উপকূলজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ, ব্যস্ততা আর নতুন দিনের শুরু। জেলেদের মুখে আনন্দের ঝিলিক, চোখে আশা। এই মানবিক গল্পই এখন সুন্দরবনের জীবন্ত চিত্র।
স্বদেশ প্রতিদিন/শাহো