
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বিনা মূল্যের সরকারি পাটের বীজ চাষ করে লোকসানে পড়েছে পাট চাষীরা। যে সকল কৃষক বেসরকারি বীজ বপন করেছেন তারাই লাভবান হয়েছেন।
কৃষকদের অভিযোগ সরকারি পাটের বীজের মান ভাল না। গাছ হয় অনেক ছোট আর খুবই চিকন। বাজারে নিলেও এ পাটের ক্রেতা পাওয়া যায় না। বেসরকারি বীজের পাটের চাহিদা বাজারে বশি দামও ভালো। সরকারি বীজের মান ভালো না হওয়ায় কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকরা দিন দিন বেসরকারি বীজের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
সরেজমিনে জানা যায়, পাটের উৎপাদন বাড়াতে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণের পক্ষ থেকে ২০২৪ - ২৫ অর্থ ব্ছরে ২ হাজার ৪ জন কৃষকের মাঝে প্রণোদনা হিসেবে উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাট বীজ উৎপাদন অধিদপ্তর আর বিএডিসি থেকে পাটের লাল বীজ বিতরণ করা হয়।
সরকারি বীজের মান ভালো নয় অভিযোগ করে কৃষকরা বলেন, এ বছর প্রণোদনা বীজ যে কয়েক জন এনেছে তারা জমিতে বপন না করে ঘরেই রেখে দিয়েছেন। যে সকল কৃষকরা প্রণোদনা বীজ বপন করেছে তারা লোকসানে পড়েছে। সরকারি বীজের পাট গাছগুলো হয় চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা আর চিকন। পাট সোলাও কোনো কাজে আসেনা এক মাত্র জ্বালানি ছাড়া। যারা বেসরকারি বীজ বপন করেছে তারা বাম্পার ফলন ও বাজার দর ভালো থাকায় কৃষকরা লাভবান হয়েছেন। তাই সরকারি বীজ থেকে বেসরকারি বীজের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের মাঝে। তবে পানি না থাকায় পাট জাগ দিতে গিয়ে বাড়তি খরচ বেড়েছে কৃষকদের। পাটের বর্তমান বাজার দর রয়েছে তিন হাজার থেকে পঁয়ত্রিশ শত টাকা। প্রতি মন চার হাজার টাকা হলে লাভবান হতে পারবে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি বীজের গাছগুলো ৪ থেকে ৫ ফুটের বেশি লম্বা হয় না। গাছগুলো হয় একেবারে চিকন। ফলে পাটও ভালো হয় না। আর পাট সুলা কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় না। আমরা বাজার থেকে ৩ শ টাকা দরে গরু মার্কা সাদা বীজ কিনে জমিতে রোপণ করেছি। এ বীজের ফলন ভালো হয়। পাট গাছগুলো যেমন লম্বা তেমনি পাটও ভালো হয়। দামও পাওয়া যায় বেশি টাকা।
চরের কান্দা গ্রামের কৃষক আলফাজ উদ্দিন বলেন, সরকারি বীজ রোপনে প্রতি বিঘাতে পাট হয় ৪ থেকে ৫ মন। আর আমরা যেটা বাজার থেকে ৩ শ টাকা দরে কিনে জমিতে রোপণ করেছি সেটা বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১২ মন দরে পাট পাওয়া যায়। যে সকল কৃষক সরকারি বীজ আবাদ করেছে তাদের লোকসান হয়েছে।
কৃষানি চায়না বেগম বলেন, আমি ২ বিঘা জমিতে সরকারি লাল বীজ চাষ করেছি। এ বীজ এনে আমি লোকসানে পরেছি। লাভ হবে তো দূরের কথা পুঁজিটুকু উঠবে না। যারা বাজার থেকে সাদা বীজ কিনে এনে লাগিয়েছেন তারা লাভবান হবেন।
কৃষক রুহুল আমিন বলেন, আমাকে সরকারি বীজ দিতে চেয়েছিল আমি আনিনি। এ বীজের গাছগুলো বেশি লম্বা হয় না। আমি বাজার থেকে সাদা বীজ কিনে এনে লাগিয়েছি। ফলন খুব ভালো হয়েছে। গাছগুলো ১০ থেকে ১২ ফুট লম্বা আর মোটাও অনেক। এ বীজ থেকে উৎপাদিত পাটের চাহিদা বেশি দামও ভাল পাওয়া যায়।
কৃষক বাচ্চু মিয়া বলেন, বাজারে পাটের দামও ভালোই আছে। পানি না আসায় খরচ বেড়ে গেছে। জমি থেকে নাইল্লা কাটার পর বাড়তি খরচ দিয়ে নদীতে নিয়ে জাক দিতে হয়। একেক জন কামলার বেতন আছে ৮ শ থেকে ৯ শ টাকা। ২ জন কামলা দিয়েও ১ বিঘা জমির নাইল্লা নদীতে নেয়া যায় না। তাই খরচ বেশি পড়ে।
কৃষক মহররম আলী বলেন, পাট ভালোই হয়েছে। কাছাকাছি পানির কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পাট জাক দিতে গিয়ে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। পূর্বে আমরা জমিতেই পাট কেটে এখানেই পাট পাকাতে পারতাম। এ বছর তা করা যাচ্ছেনা।
ফাতেমা নারী শ্রমিক বলেন, ৪ টাকা মজুরিতে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছি। এগুলা সরকারি বিজের গাছ। পাট ভাল হয়নি। আঁশ ছাড়াতে অনেক কষ্ট আর সময় লাগছে বেশি। কেনা বিজের পাট অনেক ভাল হয়েছে। কাজ করতে সময়ও কম লাগে। তেমন কষ্টও হয় না। কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে সরকার কৃষকদের মাঝে উন্নত মানের বীজ সরবরাহ করবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় কৃষকদের।
উপজেলা কৃষি অফিসার আকলিমা বেগম বলেন, ভৈরবে এ বছর ৩২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। দেশি এবং তোষা পাটের তুলনায় কেনাফের আবাদ বেশি হয়। আমাদের কৃষি উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা পাটের রোগ বালাই পোকা মাকড় সম্বন্ধে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান সময়টাতে পাটের কর্তন চলছে। এ বছর ফলন ও বাজার দরও অনেক ভালো। আশা করছি সামনের মৌসুমে পাটের আবাদ আরো বৃদ্ধি পাবে।
উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাট বীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ প্রকল্প উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিহাব উদ্দিন বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে মোট ২ হাজার ৪ জনকৃষকের মাঝে তোষা আর রবি ১ নামে বীজ দিয়েছি। চলতি মৌসুমে কালিকাপ্রসাদ থেকে বেশ কয়েকজন পাট চাষী আমাকে জানিয়েছে তারা সরকারি বীজ আবাদ করে লোকসানে পড়েছে। আমরা চেষ্টা করবো বিএডিসি কর্তৃপক্ষ বা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের লোকসানের বিষয়টা যাতে পুষিয়ে দেয়ার জন্য তদবির করবো। যে বীজে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় আগামীতে সেই সব বীজ কৃষকদের মাঝে বিতরণের চেষ্টা করবো।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে