
২০২৪ সালের ১৭ জুলাই, দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সায়িদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা পরদিন, ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার, দেশজুড়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে। একই সঙ্গে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সিদ্ধান্ত নেয় রাজপথে নামার।
১৭ জুলাই বিকেলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সায়িদসহ অন্যান্য শহীদের স্মরণে প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। তারপরে শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়। লক্ষ্য ছিল ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করা। কিন্তু সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। ১৮ জুলাই ভোরে একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিজিবি জানায়, সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বরিশালে আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট ছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, তাই প্রধান টার্গেটগুলোর একটি ছিল ববি।
সকালেই পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশ ঘিরে ফেলে। বন্ধ করে দেওয়া হয় সকল গেট, ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে চলাচল নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন মূলত অবস্থান করছিল হলের শিক্ষার্থীরা, শহরের শিক্ষার্থীরা আটকে পড়ে বাইরেই। দপদপিয়া সেতু, যা শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের প্রধান পথ, সেখানে অবস্থান নেয় সশস্ত্র পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব। ফলে সরাসরি ক্যাম্পাসে আসার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষার্থীরা তখন ট্রলারে নদীপথে আসার ব্যবস্থা নেয়। অজানা ভয়, দমবন্ধ করা আতঙ্ক এবং দৃঢ় সাহস নিয়ে তারা পথে নামে। কোনো রিকশা, বাস, ভ্যান ছিল না- হাঁটতে হয়েছিল গ্রামের বাগান, সরু পথ দিয়ে। কেউ জুতা খুলে, কেউ পলিথিনে মোড়া ব্যাগ হাতে, কেউবা ক্লাসের খাতা বুকে চেপে ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করতে থাকে।
এভাবে গ্রামীণ কাঁচা পথ পেরিয়ে, মেঠোপথ ধরে, নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে একে একে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে থাকে। শহর থেকে আসা শিক্ষার্থীরা তখন হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একত্রিত হয়। আন্দোলনকারীরা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীর সহায়তা চান। অভূতপূর্বভাবে সাধারণ মানুষ- দিনমজুর, দোকানি, কৃষক, স্থানীয় বাসিন্দারা শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান। কেউ পানি দেয়, কেউ খাবার, কেউ তাদের আড়াল করে ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে সহায়তা করে।
প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যখন শিক্ষার্থীরা ৩ নম্বর গেটে পৌঁছায় এবং মহাসড়ক অবরোধ করতে চায়, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায়। পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জ শুরু করে। শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে যায় না। তারা ইট-পাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একদিকে টিয়ারশেল, গুলি; অন্যদিকে সাহস, ঐক্য, প্রতিরোধ। অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হন। কিন্তু আন্দোলন থেমে যায় না।
কয়েক ঘণ্টা সংঘর্ষ চলার পর, একসময় পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের সদস্যরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। এই আত্মসমর্পণ ছিল অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর জন্য অনুপ্রেরণা- সৃষ্টি হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস। এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ঐক্য ও প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পিছু হটে।
বছর ঘুরে ফিরে এলো সেই অনুপ্রেরণার ১৮ জুলাই।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম