
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক চেতনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠে গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রত্যাশা, সেই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের আশা ছিলো দেশের ক্যাম্পাসগুলোতেও ফিরবে গণতান্ত্রিক চর্চা। শিক্ষার্থীরা ফিরে পাবে ছাত্র সংসদ, ফিরে আসবে নীতিনির্ধারণী পর্ষদে সক্রিয় অংশগ্রহণের অধিকার। তবে, সেই আশার বিপরীতে আবারও ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই বসতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ৪২তম বার্ষিক সিনেট অধিবেশন।
শনিবার (২৮ জুন) বিকেল ৩টায় সিনেট হলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. কামরুল আহসানের সভাপতিত্বে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
তবে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ছাড়া এ সিনেট অধিবেশনকে “অপূর্ণাঙ্গ” ও “শিক্ষার্থীদের অধিকার হনন” বলে আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। তারা জানান, ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ৫৩ বছরে মাত্র ৯ বার কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে। তারপর দীর্ঘ ৩০ বছর নেই কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ফলে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই প্রতিবার সিনেট অধিবেশন সম্পন্ন হয়ে আসছে। এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
জানা যায়, ১৯৭২ সালে প্রথম জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে গোলাম মোর্শেদ ভিপি ও রোকন উদ্দিন জিএস নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালসহ মোট ৯ বার জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই এক ছাত্রের বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে সংঘর্ষ হলে তৎকালীন প্রশাসন জাকসু ও হল সংসদ বাতিল করে।
সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ৩০এপ্রিল (বুধবার) রাত পৌনে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের কাউন্সিল কক্ষে জাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান। যেখানে ভোটের তারিখ রাখা হয়েছিলো ৩১ জুলাই। তবে, জুলাই হামলায় জড়িত ও মদদদাতা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিচারকার্য পূর্বনির্ধারিত রোডম্যাপ অনুযায়ী সম্পন্ন করতে না পারায় নির্বাচনের তারিখ পেছানো হয়।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সভা শুরু হয়ে দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা মিটিং শেষে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করেন উপাচার্য।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ-১৯৭৩ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ হলো সিনেট। সিনেটে অন্যান্য প্রতিনিধির সঙ্গে অধ্যাদেশের ১৯(১) এর (ক) ও ১৯ (২) ধারা মেনে জাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করে সিনেটে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধির বিষয়টি ৩০ বছরে নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিকই অন্যান্য পর্ষদের নির্বাচন হচ্ছে। এছাড়া ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন হয়। তিন বছর মেয়াদি এই সিনেট সদস্যদের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তবে গত বছরের ১৬ অক্টোবর নির্বাচনের মাধ্যমে ৩৩ জন শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়েছে।
ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই সিনেট অধিবেশনের ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অ্যাক্টের ১৯(২) ধারায় বলা হয়েছে, ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া অন্যান্য সিনেট সদস্যরা তিন বছরের জন্য দায়িত্বে থাকবেন। আর ছাত্র প্রতিনিধিরা থাকবেন এক বছরের জন্য। তবে তারা পরবর্তী প্রতিনিধি নির্বাচিত, মনোনীত অথবা নিযুক্ত হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, ৫ আগস্ট গনঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমরা চেয়েছিলাম দ্রুততম সময়ে জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে এটা করতে পারত তবে কেন তারা এটা করলো না সেটা আমার বোধগম্য নয়। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি ছাড়া যে সিনেট অধিবেশন হচ্ছে সেখানে দাবি দেওয়ার বিষয়গুলো আসবে না বলে মনে করি। শিক্ষার্থী কল্যাণ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে আনার জন্য সিনেটে অবশ্যই ছাত্র প্রতিনিধি থাকা দরকার ছিল।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুহিবুর রহমান মুহিব বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে গণতান্ত্রিক চর্চার উদ্ভব হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের অন্যতম মাধ্যম হলো জাকসু নির্বাচন। কিন্তু বারবার তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সেই চর্চার ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। সেখানে বার্ষিক বাজেট উত্থাপন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় এক্ট অনুসারে সিনেটে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও, গত ৩৩ বছর ধরে সেই পথ রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অধিকার, সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরতে পারে। ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া সিনেট অধিবেশন পরিচালনা শিক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের অবহেলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শাখা গনতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের আহবায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জল বলেন, গত ৩৩ বছর ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিশ্চিত হয়নি। ফলে সিনেট অধিবেশনে শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। আমরা মনে করেছিলাম, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যে প্রশাসন দায়িত্ব নিয়েছে, তারা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় রূপ দিবে। জাকসু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে সিনেটে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিশ্চিত করবে। তবে প্রতিবারের মতো আমরা আবারও আশাহত হয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট-১৯৭৩ অনুযায়ী সিনেটের মোট সদস্য সংখ্যা ৯৩ জন। তারা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), কোষাধ্যক্ষ, সরকার মনোনীত পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তা, স্পিকার মনোনীত পাঁচজন সংসদ সদস্য, আচার্য মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট মনোনীত পাঁচজন গবেষক প্রতিনিধি, একাডেমিক কাউন্সিল মনোনীত পাঁচজন কলেজ অধ্যক্ষ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের (ঢাকা) চেয়ারম্যান, ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি, ৩৩ জন শিক্ষক প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচিত পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি।
স্বদেশ প্রতিদিন/ কেআইকে