
ইরানে ইসরায়েলের সামরিক হামলার বিরুদ্ধে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বিবৃতি থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে ভারত। এতে রাশিয়া ও চীন নেতৃত্বাধীন এই আঞ্চলিক জোটে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত মিলেছে।
গত শুক্রবার ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ে। ইরান জানায়, এসব হামলায় অন্তত ৮০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরমাণু বিজ্ঞানী ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। জবাবে ইরান টেল আভিভ ও হাইফায় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যাতে অন্তত ১৩ জন নিহত হন।
এই পটভূমিতে চীন-চেয়ারম্যানশিপে থাকা এসসিও শনিবার এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, “এসসিও সদস্য রাষ্ট্রসমূহ ইরানের সার্বভৌমত্বে এই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে এবং কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক উপায়ে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান চায়।”
ভারতের ভিন্ন অবস্থান
এসসিওর এই বিবৃতিতে ভারত সই করেনি এবং আলোচনাতেও অংশ নেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, “আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং উভয় পক্ষকে কূটনৈতিক উপায়ে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছি। ভারত ইসরায়েল ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় যেকোনো সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের এমন অবস্থান স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের পক্ষে না হলেও, তা এসসিওর নিন্দা বিবৃতির জোর খাটো করেছে।
ভারতের দ্বৈত সম্পর্ক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য
বিশ্লেষক শ্যান্থি ডি’সুজা বলেন, “ভারতের একটি জটিল অবস্থান রয়েছে—একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক।”
ভারত বর্তমানে ইসরায়েলের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা এবং ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধ চলাকালে ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইসরায়েলে রকেট ও বিস্ফোরক রপ্তানি করেছে।
অন্যদিকে ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়নেও ভারতের বড় বিনিয়োগ রয়েছে, যা পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের পথ খুলে দেয়।
বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, “ভারতের জন্য এটি নতুন কিছু নয়। তারা বহুদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে—হোক তা রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন বা সৌদি-ইরান।”
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও ভারতের কৌশলগত হিসাব
২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেন। এর ফলে চাবাহার প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আশায় ভারত জাতিসংঘে গাজা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব থেকেও বিরত থাকে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত এমন এক ‘আউটসাইডার ইনসাইডার’—যে এসসিওর সদস্য হলেও পুরোপুরি ব্লকের নীতির অনুসারী নয়। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠতা যেখানে প্রকট, সেখানে ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ