
সংগৃহীত ছবি
ইরানকে ঘিরে ‘পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র’ হওয়ার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বরাজনীতিতে আলোচিত ও বিতর্কিত। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ইরান হয়তো বহু আগেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা অর্জন করেছে, কিন্তু কৌশলগত কারণে তা ঘোষণা করেনি—এমনকি অস্ত্র তৈরিও করেনি। এ ধরনের অবস্থানকে বলা হয় "nuclear opacity" বা পরমাণু অনিশ্চয়তা, যেমনটা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল করে আসছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সূচনা ঘটে ১৯৫৭ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের “Atoms for Peace” কর্মসূচির অংশ হিসেবে। শাহ মোহাম্মদের আমলে পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র ও রিঅ্যাক্টর তৈরি হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর পশ্চিমা সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু ইরান স্বাধীনভাবে এই কর্মসূচি চালিয়ে যায়। ২০০২ সালে ইরানের নাতানজ ও আরাকের গোপন পারমাণবিক স্থাপনার তথ্য ফাঁস হলে বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়।
এই তথ্য সামনে আসার পর থেকেই ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা (IAEA)-এর নজরদারির আওতায় আসে। ইরান দাবি করে, তার কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ—শুধু জ্বালানি উৎপাদন ও চিকিৎসা গবেষণার জন্য। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, বিশ্বাস করে এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের হার যত বাড়ে, ততই একটি বোমা তৈরির দিকে দেশটি এগিয়ে যায়।
ইরান বর্তমানে ৬০% পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজন ৯০%। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান চাইলে কয়েক মাসের মধ্যেই পর্যাপ্ত পরিমাণে অস্ত্রযোগ্য ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে পারে—এটিকে বলা হয় breakout time। এই সময়সীমার মধ্যে দেশটি একটি কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে, যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসে।
২০১৫ সালে করা Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA) ছিল এই সংকট নিরসনের এক বড় পদক্ষেপ। চুক্তির আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমিয়ে আনে, আধুনিক সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহার বন্ধ রাখে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের দরজা খুলে দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে চুক্তি থেকে বের হয়ে গেলে ইরান আবারো সমৃদ্ধকরণ বৃদ্ধি করে।
ইসরায়েল বহুবার দাবি করেছে, ইরান গোপনে অস্ত্র তৈরির গবেষণা চালিয়েছে। তারা ২০১৮ সালে ‘পারমাণবিক আর্কাইভ’ উদ্ধার করার কথাও বলে, যেখানে অস্ত্র নির্মাণের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও ডিজাইন ছিল। যদিও ইরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গভীর বাস্তবতা হলো—ইরান হয়তো এখনও পরমাণু অস্ত্র বানায়নি, কিন্তু তারা সেই প্রযুক্তি ও দক্ষতা অনেক আগেই অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষায় তারা হয়তো এখনই পরমাণু অস্ত্র প্রকাশ্যে আনছে না। তবে পরিস্থিতি বদলালে এবং যদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পায়, তাহলে ইরান “nuclear threshold” অতিক্রম করতে দেরি করবে না—এমন আশঙ্কা অনেকের।
লেখক: শিক্ষক, লালমাটিয়া সরকারি মহিলা কলেজ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর