শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিকতায় গড়ছে অনন্য দৃষ্টান্ত
মানবতার বাতিঘর জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন
নাহিদুর রহমান ও রাজু আহমেদ
প্রকাশ: বুধবার, ৪ জুন, ২০২৫, ১২:২৮ AM আপডেট: ২৭.০৬.২০২৫ ১:০৮ এএম
আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দূধল ইউনিয়নের সুন্দরকাঠী গ্রামটি ছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। উন্নয়নের আলো তখনও পৌঁছায়নি। ছিল না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসার সুব্যবস্থা। মাইলের পর মাইল খাল-বিল, নদ-নদী পাড়ি দিয়ে বরিশাল শহরে গিয়ে লেখাপড়া করা ছিল তখন কল্পনার বাইরে। সেই সময়ে গ্রামটির কৃতি সন্তান জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা আলো ছড়ানোর উদ্যোগ নেন। স্বপ্নচারী এই ব্যক্তি ২০০০ সালে প্রথমে গড়ে তোলেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষার কথা বিবেচনা করে ওই একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন একটি বালিকা বিদ্যালয়। পর্যায়ক্রমে তিনি গড়ে তোলেন কলেজ, মাদ্রাসা ও মেডিকেল সেন্টার।
আলো ছড়ানোর এই কাজের আরো প্রসার ঘটাতে ২০১৭ সালে নিজ নামে প্রতিষ্ঠা করেন ফাউন্ডেশন। কিছু স্বপ্ন, সংকল্প এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা থেকেই প্রতিষ্ঠা পায় 'জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন'। এখন এটি হয়ে উঠেছে হাজারো মানুষের জীবনে আশার আলো। এই ফাউন্ডেশনটি সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে যাচ্ছে নীরবে-নিভৃতে। উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা নিজ গ্রাম থেকে শুরু করে আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালিয়ে যাচ্ছেন মানবিক কার্যক্রম।
প্রতি বছর সহস্রাধিক শিক্ষার্থী ফাউন্ডেশন থেকে পায় শিক্ষাবৃত্তি ও শিক্ষাসামগ্রী। পাশাপাশি দরিদ্র রোগীদের দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা। বিশেষ করে ঈদ, রমজান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে খাদ্য সহায়তা ও ত্রাণ কার্যক্রমে দেখা যায় এই ফাউন্ডেশনকে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে মাদকবিরোধী প্রচার, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু সুরক্ষা ও পরিবেশ সচেতনতায় স্থানীয়ভাবে আয়োজন করে কর্মশালা, র্যালিসহ নানা কর্মসূচি। ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে একটি স্বেচ্ছাসেবক দল, যাদের অধিকাংশই শিক্ষিত তরুণ। এটি শুধু মানবসেবায় অবদান রাখছে না, বরং গড়ে তুলছে একঝাঁক সচেতন তরুণ নেতৃত্বও। জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন কেবল একটি দানশীল প্রতিষ্ঠান নয়—এটি একটি প্রেরণার নাম, একটি চলমান পরিবর্তনের গল্প।
জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা বলেন- মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্য। সমাজ বদলাতে হলে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে
ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা একজন সফল উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক, যিনি ইউনিয়ন গ্রুপের অধীনে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। তিনি ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের স্পনসর ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফাউন্ডেশনটি ভবিষ্যতে আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে।
এক নজরে ফাউন্ডেশন মানুষের ৫ টি মৌলিক চাহিদা, খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান,চিকিৎসা, শিক্ষা ও চিকিৎসা । এই মৌলিক চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন। জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন (JHM Foundation) একটি বেসরকারি, অলাভজনক, অরাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী চ্যারিটেবল প্রতিষ্ঠান। এটি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। “আমরা একে অপরকে সাহায্য করে একসাথে এগিয়ে যাবো”—এই স্লোগানের আলোকে প্রতিষ্ঠানটি সরকার কর্তৃক অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে থাকে।
গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহ ১) শিক্ষা বৃত্তি ২) শিক্ষার্থীদের বিনা বেতন অধ্যয়নের সুযোগ। ৩) বিনামূল্যে বই ও ইউনিফর্ম ফ্রি ৪) বয়স্ক ভাতা প্রদান ৫) গৃহ নির্মাণেআর্থিক সহায়তা ৬) এতিম -অসহায় মেয়েদের বিবাহে আর্থিক সহায়তা ৭) স্বাস্থ্য সেবায় অবদান( চিকিৎসা ও ঔষধ সরবরাহ)
ফাউন্ডেশনে সহায়তায় প্রতিষ্ঠানসমুহ: আলহাজ জাহিমা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আলহাজ আব্দুর রশিদ জাহিমা খাতুন মোল্লা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা কলেজ (ডিগ্রি অনুমোদন চূড়ান্ত) আনিছিয়া-রশিদিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা
এই ফাউন্ডেশন শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেই থেমে থাকেনি। গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীরদের জন্য তারা গ্রহণ করেছে এক অনন্য উদ্যোগ। গ্রামের দূর-দূরান্ত থেকে স্কুল ও কলেজে আসা শিক্ষার্থীদের কষ্টের কথাও বিবেচনা করেছে ফাউন্ডেশন। অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে সাইকেল। এতে অনেক দূর থেকে সাইকেল চালিয়ে স্কুল-কলেজে খুব সহজেই পৌছায় শিক্ষার্থীরা।
বাইসাইকেল পাওয়া শিক্ষার্থী মাজহারুল বলেন, আগে স্কুলে যেতে আমাদের অনেক সময় লাগতো। এখন ফাউন্ডেশন থেকে বাইসাইকেল পাওয়ায় সময় বেঁচে যাচ্ছে। সঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছি।
শিক্ষার্থী জসিম বলেন, এটি শুধু বাইসাইকেল নয় আমাদের ভবিষ্যতের পথ চলার শুরু ও স্বপ্ন।
জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন তার নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুন্দকাঠী গ্রামকে একটি উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছে, যা দেশের অন্যান্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য অনুকরণীয়।
চিকিৎসা সেবা বদলে দিচ্ছে শত জীবনের গল্প
গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের খেয়েপরে বেঁচে থাকাই তো দায়! আর চিকিৎসা বলতে গ্রামের বাজারের কোনো ফার্মেসি থেকে বড়জোর দুয়েক পাতা ট্যাবলেট। জটিল কোনো রোগেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের হাতের ছোঁয়া পায় না তারা। এমবিবিএস ডাক্তার তাদের কাছে যেন এক স্বপ্ন! এমন অসহায় চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষদের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এসেছে ফাউন্ডেশন।
গ্রামে স্থাপন করা হয়েছে একটি মেডিকেল সেন্টার। এই সেন্টারে গ্রামের অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। যে গ্রামের মানুষদের এমবিবিএস ডাক্তার দেখানো স্বপ্নের মত ছিল সে গ্রামে সপ্তাহে একদিন ফাউন্ডেশনের সহায়তায় হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা শেষে হত দরিদ্রদের বিনামূল্যে ওষুধও দিয়ে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
আশ্রয়হীনদের ভরসা
একটি গরীব বা অসহায় পরিবারের স্বপ্ন তিন বেলা খাবার নয়, স্বপ্ন হলো দিন শেষে নিশ্চিন্তে মাথা গোজার ঠাঁই। আর তাদের জন্যই আশার আলো হয়ে এগিয়ে এসেছে জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন।
দীর্ঘদিন থেকেই সুন্দরকাঠি গ্রামে মানুষের মাঝে হাসি ফোটাতে ও আশ্রয়হীনদের মাঝে টিন বিতরণ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে এ ফাউন্ডেশন থেকে প্রায় শতাধিক পরিবারকে ২ থেকে ৩ বান করে টিন ও ঘর নির্মাণ সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া অসহায় পরিবারগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে তা যাচাই করে তৈরি করে দেওয়া হয় বাড়ি। এ পর্যন্ত ১০টির বেশি বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে।
ছড়ানো হচ্ছে কোরআনের আলো
জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন সুন্দরকাঠি গ্রামে আলোকবর্তিকা হয়ে কুরআন শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে শিশুদের মাঝে। ফাউন্ডেশনটি ২০০৪ সালে এ গ্রামে এতিম, সুবিধাবঞ্চিত ও অন্যান্য শিশুদের জন্য আনিছিয়া-রশিদিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা নির্মাণ করেন।
মাদ্রাসায় বর্তমান ছাত্র সংখ্যা রয়েছে ৯১ জন। শিক্ষক রয়েছে ৯ জন।
ফাউন্ডেশন থেকে মাদ্রাসায় অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ, খাবার ও পোশাক দেওয়া হয়। এর জন্য ফাউন্ডেশন থেকে প্রত্যেক মাসে খরচ হয় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এই মাদ্রাসা থেকে প্রায় দুইশ হাফেজ তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে বিভিন্ন জায়গায় কোরআন শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন।
দৃষ্টিনন্দন মসজিদ
মানবতার কল্যাণে নিবেদিত জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক আলোর পথযাত্রী। গ্রামের উন্নয়নের জন্য যেমন কাজ করে যাচ্ছেন তেমনি ধর্মীয় বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
মহতি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ২০০০ সালে ফাউন্ডেশনটি একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ তৈরি করে। সুন্দরকাঠি বাইতুল আমান জামে মসজিদটি দুইতলা বিশিষ্ট। এটি ছাড়াও ২০০০ সাল থেকে হাওলাদার বাড়ি জামে মসজিদ, হযরত শেখ তাজউদ্দীন আহমেদ (আঃ) জামে মসজিদ, গারিরুল্লাহ জামে মসজিদ, সুন্দরকাঠি বাইতুল আউলিয়া জামে মসজিদ, বায়তুল মামুর জামে মসজিদ, পূর্ব সুন্দরকাঠি জামে মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদে দান কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন। এছাড়া, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমে ফাউন্ডেশনটি সক্রিয়ভাব অংশগ্রহণ করে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা
জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশন দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এই ফাউন্ডেশন দুস্থ নারী-পুরুষদের মাঝে শাড়ি ও লুঙ্গি বিতরণ এবং বয়স্কদের জন্য মাসিক ভাতা প্রদান করে থাকে। যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের খরচ মেটাতে সহায়তা করে।
সামাজিক কার্যক্রম হিসেবে বিভিন্ন সময়ে হতদরিদ্র পরিবারকে দেয়া হয় উপহার সামগ্রী। গ্রামের অসহায় মানুষদের মাঝে দেয়া হয় নগদ অর্থ। এমনকি সুন্দরকাঠি গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের কন্যাদের বিবাহের সময় এই ফাউন্ডেশন থেকে দেয়া হয় আর্থিক সহায়তা।
আর্থিক অনুদান পাওয়া নজরুল ইসলাম বলেন, আমার মেয়েদের বিয়ে দেয়ার সময় অর্থ সংকটে পড়ি। তখন জাহাঙ্গীর মোল্লা ফাউন্ডেশন আর্থিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ায়। এই ঋণ কখনো ভুলবো না। শুধু আমাকেই নয়, গ্রামের অনেক পরিবারকেই এমন আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে তারা।