বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেয়া হবে না       নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মোংলায় বিএনপির বিক্ষোভ       আওয়ামী লী‌গের তিন নেতা গ্রেপ্তার      সাতক্ষীরায় জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রকল্পের সমাপনী      সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ       আইনশৃঙ্খলা সভায় হট্টগোল, তর্কে জড়ালেন এমপি হান্নান      লাতিন আমেরিকার দুই দলকে হারাল জাপান-কোরিয়া      কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৫১ কিশোর আটক      প্রথম ১৪ ওয়ানডেতেই ইতিহাস গড়লেন ম্যাথু ব্রিটজকে      ২৫ সেপ্টেম্বরের মুর্তজা কিজিলবাশের কনসার্ট স্থগিত      অঙ্কন-নন্দিতার দ্বৈত কণ্ঠে আজ প্রকাশিত হচ্ছে ‘মথুরা’      ফোটন সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন      
২৫ বছর ধরে আলো ছড়ানো দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি
নাজমুল হক ও মনির জামান
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৫, ৭:৫৪ পিএম আপডেট: ২৯.০৪.২০২৫ ১১:৪৫ এএম

২০০০ সাল। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দূধল ইউনিয়নের সুন্দরকাঠী গ্রামটি তখন ছিল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বলা যায়, একেবারে ‘অজপাড়া গাঁ’। ছিল না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসা কেন্দ্র। মাইলের পর মাইল খাল-বিল, নদ-নদী পাড়ি দিয়ে বরিশাল শহরে গিয়ে লেখাপড়া করা ছিল কল্পনার বাইরে।

সেই সময়ে গ্রামটির কৃতি সন্তান জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা আলো ছড়ানোর উদ্যোগ নেন। স্বপ্নচারী এই ব্যক্তি ও তার প্রতিষ্ঠিত একটি ফাউন্ডেশনের নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা হয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষার কথা বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি বালিকা বিদ্যালয়। পর্যায়ক্রমে তিনি গড়ে তোলেন কলেজ, মাদ্রাসা ও একটি মেডিকেল সেন্টার।


কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো-দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে আলো ছড়ানো একমাত্র বালিকা বিদ্যালয় এবং কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়নি। বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ। সব নীতিমালা ঠিক থাকলে এত বছরেও কেন এমপিওভুক্ত করা হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আলহাজ্ব জাহিমা খাতুন প্রাথমিক বিদ্যালয়। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আলহাজ্ব আব্দুর রশিদ জাহিমা খাতুন মোল্লা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। এরপর শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের কথা ভেবে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা কলেজ।


মোল্লা ফাউন্ডেশনের সহায়তায় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয় বিনামূল্যে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিনামূল্যে বই, ইউনিফর্ম এবং অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী। দেওয়া হয় শিক্ষাবৃত্তিও। যাতায়াতের সুবিধার জন্য দূর থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীদেরকে দেওয়া হয়েছে সাইকেল। এছাড়া বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং নামমাত্র মূল্যে ওষুধ প্রদান করা হয়। ফলে যে সুন্দরকাঠী গ্রামের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হতো, সেখানে এই প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, যারা ভূমিকা রাখছে দেশ ও জাতি গঠনে।
 

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য বজায় রেখে আসছে স্কুল ও কলেজটি। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর আবেদনের প্রেক্ষিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি কলেজের অনুমোদন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। স্কুল ও কলেজের গত চার বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান দুটি প্রায় শতভাগ পাসের হার অর্জন করেছে।

জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা কলেজে ২০২১ ও ২০২২ সালে পাশের হার ছিল শতভাগ, ২০২৩ সালে ছিল ৯৯.৪০ শতাংশ, এবং ২০২৪ সালে ছিল ৯৮.১৪ শতাংশ। এই ৪ বছরে মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশ জিপিএ ৫ পেয়েছে। এছাড়া স্কুলে পাশের হার ছিল ২০২১ সালে ৮৯.৪৮ শতাংশ, ২০২২ ও ২০২৩ সালে শতভাগ, এবং ২০২৪ সালে পাশের হার ছিল ৯২.৬৮ শতাংশ।

বর্তমানে কলেজটিতে ৩৬১ জন শিক্ষার্থীর জন্য মোট ১৯ জন শিক্ষক রয়েছেন, এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৮ জন কর্মচারী আছেন। এছাড়া স্কুলটিতে ২৮০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৯ জন শিক্ষক এবং ৪ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন। স্কুলটি ২০১৩ সালে পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতি পায়, এবং কলেজটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও পাঠদানের অনুমতি পায় ২০১৮ সালে এবং স্বীকৃতি পায় ২০২২ সালে। স্কুলের জমির পরিমাণ ৫ বিঘা এবং ১২,০০০ স্কয়ার ফুটের ভবন। অপরদিকে, কলেজের জমির পরিমাণ ৮ বিঘা এবং ১৪,০০০ স্কয়ার ফুটের ভবন।


মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত প্রায় বিচ্ছিন্ন একটি গ্রামে ২৫ বছর ধরে শিক্ষায় যে প্রতিষ্ঠান দুটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে, তবুও আজও প্রতিষ্ঠান দুটি এমপিওভুক্ত হয়নি। অথচ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটির জমির পরিমাণ, অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতি, শিক্ষার্থী সংখ্যা, ফলাফলসহ শতভাগ পাশের হার, সব সরকারি শর্ত পূরণ করা হয়েছে। তবুও কেন এই প্রতিষ্ঠান দুটি এমপিওভুক্ত হচ্ছে না, তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে ২০১৮ ও ২০২১ সালে দুটি আবেদন করা হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে জানা গেছে।


সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, উপজেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠান দুটির এমপিওভুক্ত না হওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক এবং জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঘুষ না দেওয়াই এমপিওভুক্ত না হওয়ার মূল কারণ।

তাদের দাবি, এই স্কুলটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি সমাজের হাজারো মানুষের স্বপ্ন পূরণের চালিকাশক্তি। এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে না উঠলে হাজার হাজার নারী, শিশু বা কিশোর মৌলিক শিক্ষার্জন থেকে বঞ্চিত হতো। সরকারের উচিত ছিল অনেক আগে এ প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ এমন উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানো। ফলে মানুষ আরও বেশি উদ্যোগী হতো এমন সমাজকল্যাণমূলক কাজে।

স্থানীয় ইমরান মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এদেশে শিক্ষামন্ত্রণালয়ই বড় ঘুষখোর...এতো বড় একটা ইস্কুল আর কলেজ এতো বছরেও যে এমপিও অইলে না...এইডা কি সরকারের চোহে পরে না। ঘুষ দিলে তো ২০ বছর আগেই এমপিও অইতো...’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, ‘এই স্কুলের চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে, কিন্তু আমাদের আবেদন উপেক্ষা করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা ২৫ বছর ধরে স্কুলটি চালাচ্ছি, কিন্তু এমপিওভুক্ত হচ্ছে না। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি সকল শর্ত পূরণ করেছে। এটি কেন হচ্ছে না, তা আমার বোধগম্য নয়।’

জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা কলেজের অধ্যক্ষ গৌরচন্দ্র মন্ডল বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত করা হলে, এই এলাকার সন্তানরা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র গঠনে অবদান রাখাসহ দেশের একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার সুযোগ পাবে। সরকারি সহায়তা পেলে আমরা আরও বেশি শিক্ষার্থীকে মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারবো।’

আলহাজ্ব আব্দুর রশিদ মোল্লা জাহিমা খাতুন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারায়ন চন্দ্র দাস স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বড়ই পরিতাপের বিষয়, আমাদের এখানে অবকাঠামো, সুন্দর পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ, পাঠদানের সুযোগ থাকলেও, আমাদের স্কুলটি এমপিওভুক্ত হচ্ছে না। অথচ আমাদের অনেক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা বিভিন্ন স্কুলও এমপিওভুক্তির আওতায় চলে এসেছে, যা আমাদের হতাশ করছে।’

এ বিষয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার খন্দকার আমিনুল ইসলাম স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এমপিওভুক্তির বিষয়টি আমাদের এখতিয়ার নয়। এক বছর কিংবা দু’বছর পর সরকার যখন মনে করে, তখন বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অনলাইনে আবেদনের আহ্বান করে থাকে। মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ে কমিটি গঠন করে, ক্যাটাগরি বিবেচনা করে তালিকা তৈরি করে এমপিওভুক্তির পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বর্তমানে আমাদের হাতে কিছু নেই।’

বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এমপিওভুক্তির বিষয়টি মূলত উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। যেহেতু এত বছরেও প্রতিষ্ঠান দুটি এমপিওভুক্ত হয়নি, পরবর্তীতে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হলে, প্রতিষ্ঠান দুটি যদি সব ক্রাইটেরিয়া পূর্ণ করে থাকে, তবে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।’

এই বিষয়ে বেসরকারি মাধ্যমিক-১, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব সাইয়েদ এ. জেড মোরশেদ আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এখন এমপিওভুক্তির আবেদন বন্ধ আছে। নতুন করে আবেদন শুরু হলে এবং শর্ত পূরণ করে আবেদন করলে, আমরা বিবেচনা করবো।’



স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম


আরও সংবাদ   বিষয়:  আলহাজ্ব জাহিমা খাতুন প্রাথমিক বিদ্যালয়   আলহাজ্ব আব্দুর রশিদ জাহিমা খাতুন মোল্লা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়   জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা কলেজ  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close