
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ডানপন্থী থিঙ্ক ট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের একটি গোপন নীতিপত্র সম্প্রতি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত বছর প্রকাশিত এই নীতিপত্রটির নাম ‘প্রজেক্ট এসথার’, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন ও অধিকারকর্মীদের দমন করার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের পর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন ওই রূপরেখার কয়েকটি সুপারিশ কার্যকর করতে শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কী রয়েছে প্রজেক্ট এসথারে?
প্রজেক্ট এসথার এমন এক “প্লেবুক” বা কৌশলপত্র, যাতে দাবি করা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ও ব্যক্তি “হামাস সমর্থক নেটওয়ার্ক”-এর অংশ। যদিও এর কোনো আইনি বা প্রামাণ্য ভিত্তি নেই, এবং যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর আইন থাকার পরও প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নীতিপত্রে বলা হয়, “হামাস সমর্থক নেটওয়ার্ক এমন এক গোষ্ঠী, যারা সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে হামাসের স্বার্থে কাজ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।” এই যুক্তির ভিত্তিতে প্রজেক্ট এসথার ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকে “সন্ত্রাসবাদে সহায়তাকারী” হিসেবে তুলে ধরেছে।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা
এই নীতিপত্রের মূল পরিকল্পনায় রয়েছেন ভিক্টোরিয়া কোয়েটস, যিনি হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ট্রাম্পের আগের মেয়াদে ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার ছিলেন।
প্রজেক্ট এসথার মূলত ‘প্রজেক্ট ২০২৫’ নামের আরও বড় একটি পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজানো। ট্রাম্প শুরুতে এসব নীতিপত্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও, বর্তমানে তার প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ এই সুপারিশের বাস্তবায়নের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
টার্গেটে কারা?
প্রজেক্ট এসথারে যেসব সংগঠনকে সরাসরি হামাস-সম্পৃক্ত বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে—
American Muslims for Palestine (AMP)
Jewish Voice for Peace (JVP)
ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন
মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত অধিকারকর্মীরা
AMP-এর নির্বাহী পরিচালক ওসামা আবু ইরশাইদ বলেন, “এই ধরনের হামলা আসলে মুসলিম নাম শুনলেই এক ধরনের অপরাধী ভেবে নেওয়ার ধারাকে বৈধতা দেয়। তারা চায়, আমাদের মতো সংগঠনের উপর হামলা করে পুরো আন্দোলনেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে।”
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন লক্ষ্য?
যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই প্রবণতা আরও তীব্র।
এ কারণে প্রজেক্ট এসথার বিশেষভাবে শিক্ষাঙ্গনকে লক্ষ্য করে বলেছে—
ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিল করতে হবে
“বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা” ঠেকাতে প্রতিবাদ সমাবেশে অনুমতি না দেওয়া উচিত
বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বা ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগগুলোতে ইসরায়েল-বিরোধী শিক্ষক খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত
এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশ দিয়েছে, তারা যেন মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের কার্যক্রম পর্যালোচনা শুরু করে।
কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে?
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের কোয়েটস সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, “আমরা এখন আইনগত, নীতিগত ও আর্থিক চাপ প্রয়োগ করে এই নেটওয়ার্ককে ভেঙে ফেলার পর্যায়ে আছি।”
এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে—
বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিল করা হচ্ছে
দাঙ্গা বা সহিংসতা সৃষ্টির অভিযোগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে
ক্যাম্পাসে নজরদারি ও নজরকাড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে
প্রজেক্ট এসথার সুপারিশ করে, “আইন ব্যবহার করে বিরোধীদের কোণঠাসা করতে হবে (lawfare)”। এছাড়া বিতর্কিত ওয়েবসাইট Canary Mission-এর মাধ্যমে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নাম প্রকাশ করে অপদস্থ করার কৌশলও এতে অনুমোদিত।
প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ
তবে এই আক্রমণাত্মক পদক্ষেপগুলো শুধু আতঙ্ক ছড়াচ্ছে না, বরং আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থনও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীরা।
JVP-এর রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার বলেন, “এই ধরনের প্রচার, দমনপন্থা এবং মিথ্যাচার দেখেই অনেক মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন। এটা আমাদের ভয় পাইয়ে থামিয়ে দেবে না।”
সম্প্রতি কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও ইসরায়েল বর্জন নিষিদ্ধে প্রস্তাবিত এক বিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, যুক্তি দেখিয়ে যে এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে।
AMP-এর আবু ইরশাইদ বলেন, “হ্যাঁ, এটা আমাদের মনোযোগ কিছুটা সরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের শক্তি জোগাচ্ছে—এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য।”
আল জাজিরা অবলম্বনে
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ