
গানের মঞ্চে যার পথচলা শুরু, একসময় তিনিই হয়ে উঠেছিলেন রুপালি পর্দার অন্যতম জনপ্রিয় ও স্টাইলিশ নায়ক। সত্তর ও আশির দশকে তরুণদের কাছে ফ্যাশন, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের এক আলাদা প্রতীক ছিলেন জাফর ইকবাল। গায়ক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর চলচ্চিত্রে এসে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। আজও তার নাম উচ্চারিত হলে ফিরে আসে সেই সময়ের রোমান্টিকতা, স্টাইল ও নায়কোচিত উপস্থিতির স্মৃতি।
১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশানে জন্মগ্রহণ করেন জাফর ইকবাল। সংগীত ছিল তার পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ এবং ছোট বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহ—দুজনই ছিলেন সংগীতাঙ্গনের পরিচিত মুখ। ফলে ছোটবেলা থেকেই গানের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। কৈশোরেই সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় তার।
১৯৬৬ সালে ব্যান্ড দল ‘র্যাম্বলিং স্টোন’ গঠনের মধ্য দিয়ে গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন জাফর ইকবাল। শুধু গান গাওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, গিটার বাজাতেও ছিলেন দক্ষ। তার সংগীত প্রতিভা চলচ্চিত্রের মানুষদেরও নজর কাড়ে। সুরকার আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গে কাজের সূত্রে চলচ্চিত্রের আবহসংগীত তৈরিতেও যুক্ত হন তিনি। এভাবেই ধীরে ধীরে গানের জগতের পরিচিত মুখ থেকে চলচ্চিত্রের পর্দার কাছাকাছি চলে আসেন।
চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের আগেই। ১৯৭০ সালে ‘আপন পর’ সিনেমার মাধ্যমে প্রধান নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। এরপর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর আবারও নিয়মিত হন চলচ্চিত্রে। ১৯৭৫ সালে ‘মাস্তান’ সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
জাফর ইকবালের অভিনয়ে ছিল বৈচিত্র্য। কখনো রোমান্টিক তরুণ, কখনো রাগী ও দুরন্ত যুবক, আবার কখনো জীবনযন্ত্রণায় পীড়িত কিংবা হতাশায় বিপথগামী চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অভিনয়ে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব ভঙ্গি। পর্দায় তার উপস্থিতির আকর্ষণ সহজেই টেনে নিত তরুণ দর্শকদের।
অভিনয়ের পাশাপাশি গানের সঙ্গেও অটুট ছিল তার সম্পর্ক। চলচ্চিত্রে তার ঠোঁটে জনপ্রিয় হয়েছে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’, ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী’, ‘তুমি আমার জীবন’-এর মতো গান। ফলে জাফর ইকবালের পরিচয় কখনো শুধু নায়ক কিংবা শুধু গায়ক হয়ে থাকেনি। দুই পরিচয়ই তাকে দর্শকের কাছে আলাদা করে তুলেছিল।
সত্তর ও আশির দশকে তার পোশাক, চুলের স্টাইল, ব্যক্তিত্ব ও আধুনিক উপস্থিতি তাকে তরুণদের কাছে স্টাইল আইকনে পরিণত করেছিল। সে সময়ের প্রচলিত নায়কোচিত ইমেজের বাইরে গিয়ে নিজের ফ্যাশনেবল ও রুচিশীল একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। পর্দায় তার উপস্থিতি যেমন দর্শকের নজর কাড়ত, তেমনি ব্যক্তিজীবনের স্টাইলও অনুসরণ করতেন অনেক তরুণ।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নায়ক হিসেবে প্রায় ১৫০টি সিনেমায় কাজ করেছেন জাফর ইকবাল। গান দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই পথই শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় আলোয়। গায়ক থেকে নায়ক—দুটি ভিন্ন জগতের এই যাত্রাই তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা পরিচয় এনে দেয়।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তার গান, অভিনয় এবং সেই সময়ের ফ্যাশনেবল উপস্থিতি এখনো দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত। গানের মঞ্চ থেকে রুপালি পর্দা—দুই অঙ্গনেই নিজের স্বাক্ষর রেখে যাওয়া জাফর ইকবাল তাই শুধু একজন নায়ক নন; সত্তর-আশির দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের নাম।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি