
পটুয়াখালীর দুমকিতে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকলেও থামানো যাচ্ছে না অবৈধ মৎস্য শিকার। নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও উপজেলা মৎস্য বিভাগের নিয়মিত অভিযান উপেক্ষা করেই পায়রা, লোহালিয়া ও পাণ্ডব নদীতে দিন-রাত চলছে কারেন্ট জাল ও ট্রলারের দাপট। অভিযানের খবর পেলেই দ্রুতগতির নৌকা নিয়ে সটকে পড়ছেন অসাধু জেলেরা, আর টহল দল এলাকা ছাড়লেই পুনরায় শুরু হচ্ছে মাছ ধরা। স্থানীয়দের ভাষায়—নদীতে এখন চলছে জেলে ও প্রশাসনের মনস্তাত্ত্বিক ‘চোর-পুলিশ খেলা’।
সম্প্রতি পায়রা নদীর বাহেরচর এলাকায় মৎস্য বিভাগের অভিযানকারী স্পিডবোট লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ জেলে চক্রের হামলার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে থাকা জেলেরা সংকেত দিয়ে একযোগে অভিযানকারী দলের দিকে তেড়ে আসেন এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। এতে নিরাপত্তার স্বার্থে টহল দলটি সাময়িকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও থানা পুলিশের যৌথ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দুষ্কৃতকারীরা পালিয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন ঘটনার পরও নদীগুলোতে অসাধু জেলেদের দৌরাত্ম্য কমেনি; বরং প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আরও বেপরোয়াভাবে ডিমওয়ালা ইলিশ নিধন চলছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সরেজমিনে উপজেলার পাঙ্গাশিয়া, লেবুখালী, আঙ্গারিয়া ও মুরাদিয়া-সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সরকারি বিধিনিষেধ অমান্য করে শতাধিক জেলে অবাধে জালে মাছ ধরছেন।
স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, তিন সংস্থার টহল সত্ত্বেও জেলেরা কৌশলী ভূমিকা নিচ্ছেন। অভিযানের ট্রলার বা স্পিডবোট দেখামাত্র তাঁরা দ্রুতগতির নৌকা চালিয়ে নদীর শাখা-খালে আত্মগোপন করেন। টহল শেষ হওয়ামাত্রই পুনরায় মূল নদীতে নেমে পড়েন।
লেবুখালী এলাকার বাসিন্দা মো. সোবাহান ফরাজী বলেন, “প্রশাসনের টহল চোখে পড়লেও জেলেরা তা মোটেই মানছেন না। অভিযানের সময় পালিয়ে গিয়ে পরবর্তীতে আবার প্রকাশ্যে মাছ ধরছেন। ফলে মা ইলিশ সংরক্ষণের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে।”
পাঙ্গাশিয়ার বাসিন্দা মো. আমিন জোমাদ্দার ও মো. শাহজাহান সিকদার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “তিন সংস্থার নজরদারির মধ্যেও অবাধে মা ইলিশ শিকার সত্যিই চিন্তার বিষয়। শুধু নদীতে টহল দিয়ে ফিরে গেলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হবে না। নদীর শাখা-খালসহ জেলেদের পালানোর রুটগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপ দরকার।”
আইনগত জটিলতার কথা উল্লেখ করে পায়রাকুঞ্জ নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পুলিশ পরিদর্শক) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “মা ইলিশ রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন জেলেকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজার আওতায় আনা হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে আপিল করে তাঁরা সহজে জামিনে বেরিয়ে আসছেন, যা পরবর্তীতে তাঁদের পুনরায় অবৈধ শিকারে উৎসাহিত করছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ খায়রুল চৌধুরী জানান, “মা ইলিশ সংরক্ষণে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। নৌ পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে ত্রিমুখী টহলের পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এর আগে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান জনবল ও প্রয়োজনীয় বাজেটের স্বল্পতার কথা জানিয়ে উল্লেখ করেন, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মা ইলিশ সুরক্ষায় তাঁদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে সচেতন মহলের দাবি, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে বাকি দিনগুলোতে সমন্বিত ও ধারাবাহিক কঠোর টহল নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযানকারী দলের ওপর হামলার চেষ্টায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ