
পাবনার বেড়া পৌর এলাকায় বেড়েছে চোরের উপদ্রব। রাতের আঁধারে বাড়ির গ্যাসের রাইজার, পানির মোটর, টিউবওয়েল, এমনকি ঘরের টিনও খুলে নিয়ে যাচ্ছে চোরেরা। এ যেন চুরির মহোৎসব। তবে সবচেয়ে বেশি চুরি হচ্ছে গ্যাসের রাইজার। থানা এলাকায় বারবার চুরির ঘটনা ঘটার পরও রাতের বেলা পুলিশের নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার না করার পেছনে গাফিলতিকে দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক মাসে পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লার শতাধিক বাড়ি থেকে রাইজার চুরি হয়েছে। এতে একেকজন বাড়ির মালিকের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। কয়েক দিন বন্ধ থাকছে রান্নাবান্না। রয়েছে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। অথচ চুরি করা একটি রাইজার বিক্রি করে চোরেরা চার-পাঁচ শ টাকা পেতে পারে বলে ধারণা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেড়া পৌর এলাকার কর্মকারপাড়া, দক্ষিণপাড়া, দাসপাড়া, হাতিগাড়া, পায়না ও নতুনপাড়াসহ বিভিন্ন মহল্লায় এসব চুরির ঘটনা ঘটেছে। রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর চোরেরা রেঞ্চ ও হ্যাকসো ব্লেড দিয়ে গ্যাসের পাইপ কেটে রাইজার নিয়ে যায়। এতে পাইপ দিয়ে বিকট শব্দে গ্যাস বের হতে থাকে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। বেড়া পৌর এলাকা ছাড়াও গ্রামেও বেড়েছে চুরি।
রাইজার চুরির পর নতুন করে সংযোগ চালু করতেও ভোগান্তিতে পড়ছেন বাড়ির মালিকেরা। পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের বাঘাবাড়ী কার্যালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এতে ফি অনুমোদন ও ব্যাংকে নির্ধারিত অর্থ জমা দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন লেগে যায় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ। এ সময় রান্নাবান্না বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, রাতে রাইজার চুরি হওয়ার পর পাইপ দিয়ে বিকট শব্দে গ্যাস বের হচ্ছিল। কয়েক দিন রান্নাবান্না বন্ধ ছিল। দুর্ঘটনার ভয়ও ছিল। নতুন রাইজার বসানো ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তাঁকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এখন চুরি ঠেকাতে রাইজারের চারপাশে লোহার খাঁচা বসানোর ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।
আরেক ভুক্তভোগী বলেন, রাইজার চুরি যাওয়ার পর দ্রুত গ্যাস চালু করা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগার আশঙ্কা থাকায় স্থানীয় মিস্ত্রির সহায়তায় রাইজার পুনঃস্থাপন করতে হয়েছে। এতে খরচ বেশি হলেও অপেক্ষা ও দৌড়াদৌড়ি এড়ানো গেছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে স্থানীয় মিস্ত্রির মাধ্যমে রাইজার পুনঃস্থাপন করতে বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। তবু দ্রুত গ্যাস চালু করা এবং বারবার অফিসে যাতায়াতের ভোগান্তি এড়াতে অনেকে এ পথ বেছে নিচ্ছেন। তবে এভাবে রাইজার পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে গ্যাস কোম্পানির অনুমোদন ও নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, রাইজারের পিতলের অংশের লোভে চোরেরা এগুলো কেটে নিয়ে যায়। পরে পিতল, লোহা ও পাইপ ভাঙারির দোকানে বিক্রি করা হয়। তবে কোথায় এসব মালামাল বিক্রি হচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁদের ধারণা, একটি রাইজার বিক্রি করে চোরেরা চার-পাঁচ শ টাকার বেশি পায় না। অথচ সেটি পুনঃস্থাপন করতে বাড়ির মালিকের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
শুধু রাইজার নয়, পৌর এলাকায় পানির মোটর, টিউবওয়েল ও ঘরের টিনও চুরি হচ্ছে। এতে বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। চোর চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার, পুলিশি টহল জোরদার এবং চুরি যাওয়া মালামাল কেনাবেচায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌর এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, সব চুরির মূল কারণ মাদক। চুরির মহোৎসব ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন এবং তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লায় চুরি, ছিনতাই এবং গ্যাসের মালামাল চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এবং দায়িত্বশীলতা নিয়ে বিতর্ক জোরালো রূপ নিয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের বাঘাবাড়ী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (বেড়া-সাঁথিয়া অঞ্চল) রেজাউল করিম বলেন, ‘আমি যোগ দেওয়ার পর থেকে আমার আওতাধীন এলাকাগুলোর মধ্যে শুধু বেড়াতেই রাইজার চুরির অভিযোগ পাচ্ছি। অভিযোগ পেলে সরকারি নির্ধারিত ফি নিয়ে দ্রুত রাইজার ও পাইপ লাগানোর ব্যবস্থা করছি।’
বেড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নয়ন কুমার সরকার জানান, ‘চোর ধরতে আমরা তৎপর আছি। রাইজার চুরির সঙ্গে জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। রাস্তার পাশে থাকা রাইজার চুরি করা সহজ। তাই ইটের গাঁথুনি বা লোহার খাঁচা দিয়ে সেগুলো সুরক্ষিত করতে বাসিন্দাদের অনুরোধ করেছি। ভাঙারির দোকানেও অভিযান চালাচ্ছি।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ