
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় একটি ইটভাটায় অনুমোদনহীনভাবে কৃত্রিম সার, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক তৈরির অভিযোগ উঠেছে। গত প্রায় ছয় মাস ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে সেখানে এসব কৃষি উপকরণ তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছিল বলে জানা যায়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ পুলিশ কারখানাটিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, নকলসদৃশ সার, নকল বালাইনাশক ও ছত্রাকনাশক, রং, কেমিক্যাল, ইটের রাবিশ, কাঠের গুঁড়া, খালি প্যাকেট, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ জব্দ করেছে। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক কর্মচারীসহ দুজনকে আটক করা হয়।
গতকাল শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে কালসারডারা বাজারসংলগ্ন ফারুকের বন্ধ ইটভাটায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের মোকলেছুর রহমানের ছেলে মাইদুল ইসলাম বাবু ওই বন্ধ ইটভাটাটি ভাড়া নিয়ে নকল সার তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। সেখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের, বিশেষ করে ফসফেট, পটাশ, কীটনাশক, বালাইনাশক ও ছত্রাকনাশকের নামে নকল দ্রব্য তৈরি ও প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করা হতো।
নকল এসব পণ্য বাবু নিজের দোকান ছাড়াও কালসারডারা বাজার ও আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজারে নির্বিঘ্নে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করে আসছিলেন।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, কারখানায় ম্যানকোজেব, কার্বেনডাজিম ও কপার অক্সিক্লোরাইড গ্রুপের ছত্রাকনাশক, গ্লাইফোসেট বা প্যারাকুয়াট গ্রুপের আগাছানাশক এবং ক্লোরপাইরিফস, ইমিডাক্লোপ্রিড ও সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের বালাইনাশকের প্যাকেটসহ তিন ধরনের জিআর প্যাকেট পাওয়া গেছে। এসব গ্রুপের পণ্য ‘ফেমাস এগ্রো লিমিটেড’ নামে বাজারজাত করা হচ্ছিল বলে প্যাকেট দেখে ধারণা করা হচ্ছে।
জব্দ করা পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঠের গুঁড়া, ইটের গুঁড়া, রাসায়নিক উপকরণ, চক পাউডার, রং, মোটা বালু, ফসফেট, পটাশ, ফুরাডানসদৃশ সার, রং, খালি প্যাকেট, পণ্য তৈরির যন্ত্রপাতি, দেশীয় ধারালো অস্ত্র, বই, লোগো ইত্যাদি।
এ ছাড়া নকল কারখানার হোতা মাইদুল ইসলাম বাবু রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার কালসারডারা-সংলগ্ন একটি চাতালে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গোখাদ্যে গমের ভুসির সঙ্গে ধানের ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে ‘বসুন্ধরা’ ও ‘মণ্ডল’সহ নামীদামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব পণ্য সংরক্ষণ করতে তিনি পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন বাজারসংলগ্ন এলাকায় গুদাম ভাড়া নিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান।
অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে অভিযুক্ত মাইদুল ইসলাম বাবু কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে যান।
এ নিয়ে স্থানীয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এত দিন তাঁদের ধারণা ছিল, সেখানে কেঁচো জৈব সার তৈরির কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। এ কারণে কারখানাটির কার্যক্রম নিয়ে তাঁদের তেমন সন্দেহ হয়নি। তবে প্রশাসনের অভিযানের সময় বিভিন্ন ধরনের নকলসদৃশ সার, বালাইনাশক, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ তৈরির সরঞ্জাম দেখতে পেয়ে তাঁরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন।
এ সময় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী ও বিপুলসংখ্যক স্থানীয় বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন। অভিযান দেখতে ঘটনাস্থলে উৎসুক জনতার ভিড় জমে।
ওই এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, কৃষকেরা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রোগবালাই দমনের জন্য সার ও কীটনাশক কিনে জমিতে প্রয়োগ করে থাকেন। কিন্তু এসব পণ্যের নামে নকল বা নিম্নমানের উপকরণ বাজারজাত করা হলে কৃষকেরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। পাশাপাশি ফসলের উৎপাদন, গুণগত মান ও নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁরা বলেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও কৃষি উপকরণের উচ্চমূল্যের কারণে কৃষকদের এমনিতেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে নকল কৃষি উপকরণ বাজারজাত করা হলে তাঁদের অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
তাই নকল সার কারখানার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান তাঁরা।
এদিকে, অনেকের ধারণা, শীতকালীন মৌসুমে সবজি চাষে ফসফেট, পটাশ, জিংক, ভিটামিন, বালাইনাশক ও ছত্রাকনাশকের ব্যবহার ও চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়েছিল প্রতারক চক্রটি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাদুল্লাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অপূর্ব ভট্টাচার্য বলেন, কারখানাটির কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। এ জন্য তদন্ত সাপেক্ষে জব্দ করা পণ্যাদির পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই মামলা করা হবে।
সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রওজাতুন জান্নাত জানান, জব্দ করা পণ্য ও উপকরণের প্রকৃত অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক কর্মচারীসহ দুজনকে আটক করা হয়েছে। আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম হাবিবুল ইসলাম।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নকল সার কারবারিদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছেন ওই অঞ্চলের ভুক্তভোগী কৃষকেরা। তাঁরা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ