
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো। সরকারি পর্যায়ে ফৌজদারি তদন্ত ও যৌথ তদন্ত কার্যক্রমের পাশাপাশি বিদেশের আদালতে দেওয়ানি মামলা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ছয়টি ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪০টি গোষ্ঠীকে এ প্রক্রিয়ার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রথম ধাপে নির্বাচিত ছয়টি গোষ্ঠী হলো সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত ৪০টি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থ উদ্ধারের কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো আলাদাভাবে মামলা না করে সম্মিলিত উদ্যোগ বা কনসোর্টিয়াম পদ্ধতিতে কাজ করছে। প্রতিটি ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠীর জন্য এক বা একাধিক প্রধান ব্যাংক নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ব্যাংক অন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকের পক্ষে বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
এ পর্যন্ত আটটি ব্যাংককে ছয়টি সম্মিলিত উদ্যোগের প্রধান ব্যাংক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রতিষ্ঠান, আইন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। এ কার্যক্রমে ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা চুক্তি ও কাজের অঙ্গীকারপত্র সম্পন্ন হয়েছে। এখন বাণিজ্যিক চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ‘উদ্ধার না হলে পারিশ্রমিক নয়’ নীতিতে চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থাৎ, অর্থ বা সম্পদ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক দিতে হবে না। এতে ব্যাংকগুলোর প্রাথমিক ব্যয়ের চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে ছয়টি গোষ্ঠীকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তরের গোয়েন্দা তথ্য ও প্রমাণ, ঋণ গ্রহণে অস্বচ্ছতার তথ্য এবং বিদেশে সম্পদ উদ্ধারের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেওয়ানি কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশে স্থানান্তরিত সম্পদ শনাক্ত করা, সেগুলোর ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং আদালতের মাধ্যমে সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করে ব্যাংকের পাওনা আদায় করা।
অন্যদিকে, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকারের পক্ষ থেকেও ফৌজদারি তদন্ত চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত আন্তঃসংস্থা সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স এ কার্যক্রম সমন্বয় করছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট টাস্কফোর্সকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে। এতে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা যুক্ত রয়েছেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও আর্থিক অপরাধ মোকাবিলার অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীনে ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলার তদন্তে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এসব দল এস আলম, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার, ওরিয়ন, নাবিল, সামিট ও বসুন্ধরা গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত অর্থ পাচারসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধে ১৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলায় আদালতের রায় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে ৭৬২ জনের বেশি সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫৮ জনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের জন্য ১০টি অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।
১৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত আদালতের আদেশে দেশি-বিদেশি যেসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ সংযুক্ত, জব্দ বা অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মোট মূল্য ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে দেশীয় স্থাবর সম্পদের মূল্য ১০ হাজার ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, দেশীয় অস্থাবর সম্পদ ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা, বিদেশি স্থাবর সম্পদ ১৫ হাজার ১২৪ কোটি ১ লাখ টাকা এবং বিদেশি অস্থাবর সম্পদ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে ১৬টি দেশে মোট ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, অনুসন্ধান, নিয়ন্ত্রণ ও পুনরুদ্ধারে এসব দেশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া, হংকং ও চীনের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার নেটওয়ার্কের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ।
অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির বৈঠকে পাচারকারীদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ও সম্পদ স্থানান্তর ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার সুপারিশ করেছে কমিটি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি