
স্কটল্যান্ডের এডিনবরার কাছে শান্ত জীবন কাটাতেন ৫২ বছর বয়সী ক্লেয়ার। প্রশাসনিক চাকরি, অবসরে কুকুর নিয়ে সময় কাটানো, বই পড়া ও বেকিং—এভাবেই চলছিল তাঁর জীবন। তিন বছর আগেও নিজেকে রাজনৈতিক মানুষ মনে করতেন না তিনি।
কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ তাঁর সেই জীবন বদলে দিয়েছে। ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর প্রতি সমর্থনের অভিযোগে এখন সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন তিনি।
আল জাজিরাকে ক্লেয়ার জানান, ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে গাজার চিকিৎসক ইজ্জেলদিন আবুয়েশের লেখা ‘আই শ্যাল নট হেট’ বইটি পড়ার পর ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর আগ্রহ বাড়ে। এরপর ৭ অক্টোবরের হামলা ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তিনি নিয়মিত অনুসরণ করতে থাকেন।
পরে ফিলিস্তিনের পক্ষে বিভিন্ন সমাবেশে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আইনপ্রণেতাদের চিঠি লেখা, ত্রাণের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যুক্ত হন তিনি।
২০২৫ সালের আগস্টে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন ক্লেয়ার। সংগঠনটির প্রতি সমর্থনের অভিযোগে তিন হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্লেয়ারের দাবি, জীবনে কখনো কোনো অপরাধে জড়িত না থাকলেও সন্ত্রাসবাদ আইনের দুটি ধারায় তাঁকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়া এবং অন্যদের সংগঠনটিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি পিছু হটছি না।’
অবসরজীবনেও প্রতিবাদ
ক্লেয়ারের মতো ৭০ বছর বয়সী মার্জিও আগে কখনো কোনো বিক্ষোভে অংশ নেননি। ২০২৩ সালের আর্মিস্টিস ডেতে ‘এখনই যুদ্ধবিরতি’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামেন তিনি।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন মার্জির বাবা। তাঁর শ্বশুরও রয়্যাল এয়ার ফোর্সে কাজ করেছেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে যুদ্ধবন্দি ছিলেন।
আর্থিক খাতে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসর নেওয়া মার্জি এখন স্বামীর সঙ্গে নাতি-নাতনিদের নিয়ে সময় কাটান। তবে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় গত জুলাইয়ে ওয়েস্টমিনস্টারে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে।
মার্জি বলেন, পুলিশ বাড়িতে আসতে পারে—এমন পরিস্থিতিতে নাতি-নাতনিদের তাঁদের কাছে রাখা নিরাপদ কি না, তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। তবে তাঁদের সন্তানরা এই অবস্থানকে সমর্থন করছেন।
পেশাজীবীরাও নামছেন আন্দোলনে
ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ব্রিটেনে শিল্পী, শ্রমিক, রেলকর্মী, আর্থিক খাতের কর্মী ও প্রশাসনিক পেশাজীবীরাও বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। গত তিন বছরে লাখো মানুষ গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং এতে যুক্তরাজ্যের ভূমিকার প্রতিবাদ করেছেন।
বিক্ষোভকারীদের অনেকে ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ এবং দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
২০২৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ করার পর আন্দোলন আরও জোরালো হয়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’সহ বিভিন্ন গোষ্ঠী অহিংস অসহযোগ ও নাগরিক অবাধ্যতার কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ৭ অক্টোবর হামলার তৃতীয় বার্ষিকী ঘিরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বুধবার লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, উত্তর লন্ডনে ব্রিটিশ ইহুদি সংগঠনগুলোর একটি কার্যালয়ের বাইরে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
গাজা যুদ্ধ বদলে দিয়েছে দৃষ্টিভঙ্গি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। হামাসের ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৪০ জনের বেশি জিম্মি হন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাপক ধ্বংসের মুখে পড়েছে উপত্যকার বড় অংশ।
মার্জি বলেন, ছোটবেলায় ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল নিয়ে যে বর্ণনা শুনে তিনি বড় হয়েছেন, তা নিয়ে এখন তাঁর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার কারণে নাগরিক স্বাধীনতার ওপরও চাপ বাড়ছে।
মার্জির মাতামহী ইহুদি ছিলেন। তিনি মনে করেন, গণহত্যা বন্ধের দাবি তোলা ইহুদিবিদ্বেষ নয়। ইহুদি জনগণ ও অবৈধ দখলদারিত্বকে সমর্থনকারীদের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণে ‘ওয়ার্কার্স ফর ফ্রি প্যালেস্টাইন’ গড়ে ওঠে। সংগঠনটির ভাষ্য, অনেক মানুষ তাঁদের শ্রম কীভাবে ইসরায়েলের পক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে আপত্তি জানালেও ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার নেই বলে মনে করেন।
তবে ঝুঁকি সত্ত্বেও আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ আশাবাদী। মার্জির ভাষায়, কিছু না করলে মানুষের মধ্যে অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ তৈরি হয়। তাঁর আশা, একসময় মানুষ বুঝতে পারবে—ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার কারণে ব্রিটেনে নাগরিক স্বাধীনতার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ