
ক্যানসার শনাক্তে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে কুকুরের ঘ্রাণশক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে তৈরি একটি পদ্ধতি। ভারতের বেঙ্গালুরুর উপকণ্ঠে ‘ডগনোসিস’ নামের একটি বায়োটেক স্টার্টআপ মানুষের নিঃশ্বাসের নমুনা থেকে ক্যানসারের লক্ষণ শনাক্তের এই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি ও গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো রোগ শরীরে বাসা বাঁধলে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে নিঃশ্বাসে নির্দিষ্ট ধরনের গন্ধ তৈরি হতে পারে। মানুষের নাকে যেখানে প্রায় ৫০ লাখ ঘ্রাণগ্রাহী রিসেপ্টর রয়েছে, সেখানে কুকুরের নাকে রয়েছে প্রায় ৩০ কোটি রিসেপ্টর। ফলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম গন্ধ শনাক্তে কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
এই ক্ষমতাকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে গবেষণাগারে প্রশিক্ষিত কুকুরদের সেন্সরযুক্ত বিশেষ পোশাক ও থ্রিডি-প্রিন্টেড হেলমেট পরানো হচ্ছে। ‘ডগনোসিস’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা আকাশ কুলগোদ ভালোবেসে এই ব্যবস্থার নাম দিয়েছেন ‘ডগি আয়রন ম্যান’ স্যুট।
পদ্ধতিটি তুলনামূলক সহজ। একজন রোগীকে একটি সুতি মাস্কে প্রায় ১০ মিনিট স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে হয়। এরপর মাস্কটি একটি ব্যাগে সংরক্ষণ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। সেখানে রোগীর সঙ্গে কুকুরের সরাসরি কোনো শারীরিক সংস্পর্শের প্রয়োজন হয় না। প্রশিক্ষিত কুকুর নমুনার গন্ধ শনাক্ত করে সম্ভাব্য রোগের উপস্থিতি সম্পর্কে সংকেত দেয়।
এখানে শুধু কুকুরের আচরণের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না। কুকুরের মস্তিষ্কের তরঙ্গ, শ্বাসের গতি ও অঙ্গভঙ্গি সেন্সরের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট ডেটায় রূপান্তর করে। গবেষকদের দাবি, প্রশিক্ষিত কুকুরগুলো এক ঘণ্টায় হাজার হাজার নমুনা পরীক্ষা করতে সক্ষম।
কর্ণাটকের ছয়টি হাসপাতালের ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত ডগনোসিসের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা ‘জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’তে প্রকাশিত হয়েছে। এতে সাত ধরনের ক্যানসার শনাক্তের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির নির্ভুলতার হার ৯০ শতাংশের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই ফলাফলকে এখনই চিকিৎসায় ব্যবহারের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বেঙ্গালুরুর রামাইয়া মেমোরিয়াল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. সন্তোষ কুমার দেবদাস গবেষণাটিকে প্রাথমিক পর্যায়ের হলেও আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে মনিপাল হাসপাতালের অনকোলজিস্ট ডা. নীলেশ রেড্ডি সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন।
গবেষণাগারে ক্লোই নামের একটি ল্যাব্রাডর মিক্সসহ বিগল, ম্যালিনয়েস ও শেফার্ড জাতের প্রায় ১৫টি কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ‘স্নিফস্পেস’ নামের কেন্দ্রে ইতিবাচক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের নির্দিষ্ট গন্ধ শনাক্ত করতে শেখানো হয়। প্রতিদিন তাদের মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট কাজ করানো হয় এবং সঠিকভাবে নমুনা শনাক্ত করতে পারলে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়া হয়।
গবেষকদের আশা, আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুমোদনের মাধ্যমে এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী ও অ-আক্রমণাত্মক ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের একটি বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। তবে ক্যানসার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত চিকিৎসা পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহারের আগে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক যাচাই প্রয়োজন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি