
বলিউড অভিনেত্রী রানী মুখার্জির মা কৃষ্ণা মুখার্জি মারা গেছেন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। যশ রাজ ফিল্মসের পক্ষ থেকে পরিবারের হয়ে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে।
তবে কৃষ্ণা মুখার্জির মৃত্যুর কারণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তাঁর শেষকৃত্য কবে ও কোথায় হবে, সে বিষয়েও পরিবারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
যশ রাজ ফিল্মসের বিবৃতিতে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গভীর শোকের সঙ্গে কৃষ্ণা মুখার্জির মৃত্যুর খবর জানানো হচ্ছে। এই কঠিন সময়ে ভালোবাসা, প্রার্থনা ও সমর্থন জানানোর জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে পরিবার। একই সঙ্গে শোকের সময়ে পরিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মেয়ের অভিনয়জীবনে মায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
কৃষ্ণা মুখার্জি শুধু রানী মুখার্জির মা ছিলেন না, মেয়ের অভিনয়জীবনের শুরুতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রানী তাঁর মায়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক এবং অভিনয়ে আসার পেছনে কৃষ্ণার ভূমিকার কথা বলেছেন।
রানী একবার জানিয়েছিলেন, অভিনেত্রী হওয়ার সিদ্ধান্তটি মূলত তাঁর নিজের ছিল না। মা-ই তাঁকে অভিনয়ে আসার কথা বলেছিলেন। যদিও মেয়ের প্রথম স্ক্রিন টেস্ট দেখে কৃষ্ণা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। বরং তিনি প্রযোজককে রানীকে বাদ দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে রানী জানান, তাঁর মা মনে করেছিলেন, রানী অভিনয় করলে ছবিটির প্রযোজকের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য সেই সংশয় কাটিয়ে দীর্ঘ সফল অভিনয়জীবন গড়ে তোলেন রানী।
রানীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর অভিনয়ের সম্ভাবনা তিনি নিজে বুঝে ওঠার আগেই তাঁর মা তা বুঝতে পেরেছিলেন। ছোটবেলায় মায়ের কথা মেনে চলতেন বলেই অভিনয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’তে মায়ের অনুপ্রেরণা
মা-মেয়ের গভীর সম্পর্কের আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় রানী অভিনীত ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবিতে।
২০২৩ সালে ছবিটির প্রচারের সময় রানী জানিয়েছিলেন, বাস্তব চরিত্রের বিভিন্ন তথ্য ও ভিডিও দেখার পাশাপাশি চরিত্রটি নির্মাণে তিনি নিজের মায়ের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন।
ছবিতে এক বাঙালি মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন রানী। সন্তানকে হাতে করে খাওয়ানো, আদর-যত্ন করা এবং সন্তানের প্রতি মায়ের আবেগ—এসব আচরণ তিনি কৃষ্ণা মুখার্জির কাছ থেকেই অনেকটা নিয়েছিলেন বলে জানান।
রানীর মতে, কৃষ্ণা ছিলেন তাঁর দেখা সবচেয়ে বাঙালি মানুষদের একজন। ফলে পর্দায় মায়ের চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে নিজের মায়ের অভিজ্ঞতা ও আচরণ তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল।
নিজেও ছিলেন প্লেব্যাক গায়িকা
কৃষ্ণা মুখার্জি নিজেও চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে কাজ করেছেন। কয়েক দশকজুড়ে বিভিন্ন ছবিতে তাঁর গানের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
‘মোমের আলো’ (১৯৬৪), ‘হাইওয়ান’ (১৯৭৭), ‘তিসরি আঁখ’ (১৯৮২) এবং ‘তোমার রক্তে আমার সোহাগ’ (১৯৯৩)–এর মতো ছবিতে তাঁর প্লেব্যাকের তথ্য রয়েছে।
১৯৮২ সালের ‘তিসরি আঁখ’ ছবির ‘ঈদ কে দিন গলে মিল লে রাজা’ গানটির সঙ্গেও কৃষ্ণা মুখার্জির নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ‘ইসি কা নাম জিন্দেগি’ ছবিতে পোশাক পরিকল্পনার সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত ছিল।
চলচ্চিত্র পরিবারে বেড়ে ওঠা রানী
কৃষ্ণা মুখার্জি বিয়ে করেছিলেন পরিচালক রাম মুখার্জিকে। হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রে কাজ করা রাম ছিলেন ফিল্মালায়া স্টুডিওর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ‘হাম হিন্দুস্তানি’ ও ‘লিডার’-এর মতো চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছিলেন।
রানী মুখার্জির চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ১৯৯৬ সালের বাংলা ছবি ‘বিয়ের ফুল’-এর মাধ্যমে। ছবিটির পরিচালক ও প্রযোজক ছিলেন তাঁর বাবা রাম মুখার্জি।
রাম ও কৃষ্ণার দুই সন্তান—রানী ও রাজা মুখার্জি। রাজাও পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১৭ সালের অক্টোবরে ৮৪ বছর বয়সে মারা যান রাম মুখার্জি।
মুখার্জি পরিবারের সঙ্গে বলিউডের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। কৃষ্ণা মুখার্জির বোন অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। রানীর আত্মীয়দের মধ্যে রয়েছেন অভিনেত্রী কাজল, তানিশা মুখার্জি এবং পরিচালক অয়ন মুখার্জির মতো পরিচিত ব্যক্তিরা।
তিন দশকের ক্যারিয়ারে রানী মুখার্জি
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি অভিনয়ে আসার পর রানী মুখার্জি বলিউডের পরিচিত অভিনেত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন। ‘গুলাম’, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘সাথিয়া’, ‘হাম তুম’, ‘ব্ল্যাক’, ‘বান্টি অউর বাবলি’ এবং ‘কভি আলবিদা না কেহনা’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে ‘মর্দানি’ সিরিজে পুলিশ কর্মকর্তা শিবানী শিবাজি রায়ের চরিত্রেও দেখা যায় তাঁকে। ২০২৬ সালে মুক্তি পেয়েছে সিরিজটির তৃতীয় কিস্তি ‘মর্দানি ৩’, যা তাঁর সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র।
ব্যক্তিজীবনে রানী মুখার্জি বিয়ে করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা আদিত্য চোপড়াকে। তাঁদের মেয়ে আদিরা।
মায়ের মৃত্যুর পর এই শোকের সময়ে পরিবার ব্যক্তিগত পরিসরেই থাকতে চাইছে। যশ রাজ ফিল্মসের বিবৃতিতেও পরিবারের গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি