
১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় লিম্ফোমা সচেতনতা দিবস। লিম্ফোমা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং রোগটির লক্ষণ, চিকিৎসা ও নিরাময়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়াই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
শরীরে হঠাৎ কোনো গ্ল্যান্ড বা লিম্ফ নোড ফুলে উঠলে অনেকেরই প্রথমে মনে হয়, এটি ক্যানসারের লক্ষণ কি না। আবার কেউ কেউ বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যান। তবে দুটো প্রতিক্রিয়াই ঠিক নয়। কারণ, লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়ার পেছনে যেমন নানা সাধারণ কারণ থাকতে পারে, তেমনি এটি কখনো লিম্ফোমার প্রাথমিক লক্ষণও হতে পারে।
লিম্ফোমা কী
লিম্ফোমা হলো লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের এক ধরনের ক্যানসার। শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের মধ্যে রয়েছে লিম্ফ নোড, লিম্ফোসাইট, প্লীহা, অস্থিমজ্জা ও বিভিন্ন লিম্ফয়েড টিস্যু। এ ব্যবস্থার কোষ, বিশেষ করে লিম্ফোসাইট, অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে লিম্ফোমা তৈরি হতে পারে।
লিম্ফোমা প্রধানত দুই ধরনের—হজকিন লিম্ফোমা ও নন-হজকিন লিম্ফোমা। নন-হজকিন লিম্ফোমারও রয়েছে অনেক উপপ্রকার। প্রতিটি ধরনের রোগের গতি, আচরণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি এক নয়। তাই লিম্ফোমা শনাক্ত হওয়ার পর রোগটি কোন ধরনের এবং কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন হয়
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লিম্ফোমার নির্দিষ্ট কোনো কারণ শনাক্ত করা যায় না। তবে কিছু ভাইরাস ও সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার অস্বাভাবিকতা, কিছু অটোইমিউন রোগ এবং নির্দিষ্ট বংশগত বা পরিবেশগত কারণ এ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে লিম্ফোমা কোনো ব্যক্তির ভুল জীবনযাপন বা নির্দিষ্ট কোনো খাবার খাওয়ার কারণে হয়—এমন ধারণার ভিত্তি নেই।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
লিম্ফোমার সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো ব্যথাহীন লিম্ফ নোড বা গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া। সাধারণত গলা, বগল কিংবা কুঁচকিতে এটি দেখা যেতে পারে। তবে শরীরের ভেতরের লিম্ফ নোডও আক্রান্ত হতে পারে। বুক বা পেটের ভেতরে লিম্ফ নোড বড় হলে বাইরে থেকে তা বোঝা নাও যেতে পারে।
এ ছাড়া লিম্ফোমার সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ হলো—
- দীর্ঘদিন ধরে অকারণে জ্বর থাকা
- রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমে যাওয়া
- দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা
- ক্ষুধামান্দ্য
- শরীরে চুলকানি
- পেটে ভারী বা অস্বস্তি লাগা
- বুকের ভেতরের লিম্ফ নোড বড় হলে কাশি বা শ্বাসকষ্ট
তবে মনে রাখতে হবে, গ্ল্যান্ড বা লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া মানেই লিম্ফোমা হয়েছে—এমন নয়। সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণেও লিম্ফ নোড ফুলতে পারে। তাই কোনো অস্বাভাবিকতা দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসায় সুস্থ হওয়া সম্ভব
লিম্ফোমা নিয়ে আশার জায়গাও রয়েছে। অনেক ধরনের লিম্ফোমা বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। আবার কিছু ধরনের রোগ সময়মতো শনাক্ত হলে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনেক রোগী চিকিৎসার পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন।
রোগের ধরন ও পর্যায়, রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থা এবং নির্দিষ্ট কিছু বায়োলজিক্যাল মার্কারের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টারগেটেড থেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং নির্বাচিত ক্ষেত্রে স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ব্যবহার করা হতে পারে।
তাই লিম্ফোমা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে সচেতন হওয়া বেশি জরুরি। গ্ল্যান্ড ফুলে গেলেই সেটিকে ক্যানসার ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক লক্ষণকে অবহেলা করাও উচিত নয়। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করাই লিম্ফোমার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ