
প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদকে রাজনৈতিক বা কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বিশ্বে এখন পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
রোববার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে মোদি বলেন, বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব কোনো দেশই এখন আর এড়িয়ে যেতে পারছে না। একটি অঞ্চলের সংকটও দ্রুত অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
মোদি বলেন, মহামারি, জলবায়ু দুর্যোগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখিয়ে দিয়েছে যে পরস্পরনির্ভর বিশ্বে কোনো সংকটই শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি সম্ভাব্য ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা, সেগুলোর জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে।
এ সময় মোদি জানান, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় ব্রিকস দেশগুলো একটি সমন্বিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। আগাম সতর্কতার জন্য তথ্য একীভূত করার ব্যবস্থার নির্দেশিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্রিকস সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে মোদির বক্তব্যের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোসহ অন্যান্য দেশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ভারতের সভাপতিত্বে ব্রিকসের কার্যক্রমে স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মোদি। অংশীদার দেশগুলোর সহযোগিতার মাধ্যমে এসব অভিন্ন লক্ষ্যকে পারস্পরিকভাবে লাভজনক উদ্যোগে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে ব্রিকস নেতারা যৌথ ছবি তোলেন। সম্মেলনের বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি মোদির দক্ষিণ আফ্রিকা, কাজাখস্তান, ফিলিপাইন, মিসর, বুরুন্ডি, উগান্ডা ও নাইজেরিয়ার নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে।
সম্মেলনের আগের দিন প্রকাশিত নয়াদিল্লি ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে—এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্থায়ী সমাধানে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি ব্রিকসের সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা ইসরায়েলের আইনগত দায়িত্ব বলেও ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দ্রুত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে ব্রিকস। সুরক্ষাবাদী নীতির বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বিচারে শুল্ক বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যের নামে নতুন বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উদীয়মান অর্থনীতিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্রিকস সম্মেলনে মোদির বক্তব্যে প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সরবরাহব্যবস্থা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর এই সতর্কবার্তার সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির নেতাদের উপস্থিতি আলোচনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি