
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের পাশাপাশি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। আর এই প্রক্রিয়ায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ৫৬ হাজার ২৫৯টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন করা হয়েছে। এর ফলে ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছে এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন।
বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্রে প্রথম দফার মূল্যায়নের সঙ্গে ফলাফলের পার্থক্য ধরা পড়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—প্রথমবার পরীক্ষার্থীদের খাতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল?
গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৭ আগস্ট রাতে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হয়। আবেদন শেষ হওয়ার ২৪ দিন পর এবং মূল ফল প্রকাশের ৩১ দিন পর বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
এবারই প্রথম পুনর্নিরীক্ষণের আওতায় শুধু নম্বর যোগ-বিয়োগ বা ফল যাচাই নয়, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়াও যুক্ত করা হয়েছে। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর নম্বর ও গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে।
কোথাও সঠিক উত্তর দেওয়ার পরও নম্বর দেওয়া হয়নি, কোথাও উত্তরপত্রের ভেতরে দেওয়া নম্বর মূল পাতায় সঠিকভাবে ওঠেনি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিক উত্তরকে ভুল হিসেবে ধরে আংশিক নম্বর দেওয়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে।
বোর্ড সংশ্লিষ্টদের মতে, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হয়—এমন চাপ থাকলেও পরীক্ষকের দায়িত্ব পালনে অসতর্কতার সুযোগ নেই। কারণ একটি নম্বরের ভুলও একজন শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন করতে পারে এবং তার পরবর্তী শিক্ষাজীবনে এর প্রভাব পড়তে পারে।
সংশোধিত ফল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। মোট জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন।
ঢাকা বোর্ডে ২১ হাজার খাতার নম্বর পরিবর্তন
১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই সবচেয়ে বেশি উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে।
ঢাকা বোর্ডে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯৪ হাজার ২৩৬ জন পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। তারা মোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেন। এর মধ্যে ২১ হাজার ৬৯টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন এবং ৮ হাজার ৯৯৯ জনের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। ফেল থেকে পাস করেছে ৩৩৭ জন এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯০৬ জন।
রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৯ হাজার ৭৬২ জন ৯৮ হাজার ৭১০টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। এতে ১ হাজার ৪০৩টি উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে। ফেল থেকে পাস করেছে ১১১ জন এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৭ জন।
কুমিল্লা বোর্ডে ৪ হাজার ৭৩টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন হয়েছে। ফেল থেকে পাস করেছে ৩৩৬ জন এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০৭ জন।
যশোর বোর্ডে ১ হাজার ৯৪৪টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন হয়েছে। এ বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছে ৩৮০ জন এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৮২ জন।
চট্টগ্রাম বোর্ডে ২ হাজার ৯৭৫টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন হয়েছে। ফেল থেকে পাস করেছে ১৯০ জন এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৩ জন।
বরিশাল বোর্ডে ৩ হাজার ১১৮টি এবং সিলেট বোর্ডে ২ হাজার ৫৮৭টি উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে।
দিনাজপুর বোর্ডে ৫ হাজার ৬৩৬টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন হয়েছে। এ বোর্ডে ৮৬৭ জন শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছে এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৭৫ জন।
ময়মনসিংহে ফেল থেকে পাস ১ হাজার ১৮০
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে।
এ বোর্ডে ২৭ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী ৭১ হাজার ৬৬টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর ৫ হাজার ৩২১ জনের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এবং ৬ হাজার ৫৩৮টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন করা হয়েছে।
এর ফলে ১ হাজার ১৮০ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছেন। একই সঙ্গে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৭৭৭ জন।
৯ সাধারণ বোর্ডে বদল ৪৯ হাজারের বেশি খাতার নম্বর
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মোট ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ লাখ ৪১ হাজার ৬২৫ জন পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। তারা মোট ৯ লাখ ১৮ হাজার ৬৫০টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেন।
পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর এসব বোর্ডে মোট ২৫ হাজার ৬২০ জনের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। নম্বর সংশোধন হয়েছে ৪৯ হাজার ১৪৩টি উত্তরপত্রে।
এর মধ্যে ৩ হাজার ৬৬৬ জন ফেল থেকে পাস করেছে এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ৭৪০ জন।
মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডেও ব্যাপক পরিবর্তন
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৩ হাজার ৫০৩টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা হয়। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯৪৪টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন হয়েছে। ফেল থেকে পাস করেছে ২৫৫ জন এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৯৩ জন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৩৪ হাজার ৩০৫টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ১৭২টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন হয়েছে। এ বোর্ডে ৬৬৪ জন ফেল থেকে পাস করেছে এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৬ জন।
সব বোর্ড মিলিয়ে বদল ৫৬ হাজারের বেশি খাতার নম্বর
১১টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য একত্র করলে দেখা যায়, মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ জন পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। তারা মোট ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৮টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেন।
সার্বিক পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের পর ২৭ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। পাশাপাশি ৫৬ হাজার ২৫৯টি উত্তরপত্রের নম্বর সংশোধন করা হয়েছে।
ফলে ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী ফেল থেকে পাস করেছে এবং নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন।
প্রশ্নের মুখে প্রথম দফার খাতা মূল্যায়ন
পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের এই ফল প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পরীক্ষকদের প্রথম দফার মূল্যায়ন নিয়ে।
একজন পরীক্ষকের দায়িত্ব হলো প্রতিটি উত্তর যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে প্রাপ্য নম্বর দেওয়া এবং সেই নম্বর সঠিকভাবে মূল নম্বরপত্রে তোলা। কিন্তু পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে পাওয়া তথ্য বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়ায় ভুল হয়েছে।
সঠিক উত্তরে নম্বর না দেওয়া, উত্তরপত্রের ভেতরের নম্বর মূল পাতায় ভুলভাবে তোলা, কোনো উত্তর মূল্যায়নের বাইরে রেখে দেওয়া কিংবা সঠিক উত্তরকে ভুল ধরে শূন্য দেওয়ার মতো অসংগতি ধরা পড়েছে।
এসব ভুলের কারণে কারও একটি বিষয়ের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে, আবার কারও গ্রেড সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এমনকি কেউ ফেল থেকে পাস করেছে, কেউ পেয়েছে নতুন করে জিপিএ-৫।
বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব উত্তরপত্রে নম্বর পরিবর্তন হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের দায়িত্ব ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখা হবে।
১০ নম্বরের বেশি পরিবর্তন হলে খতিয়ে দেখা হবে
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, পুনর্নিরীক্ষণে যেসব উত্তরপত্রের নম্বর ১০ নম্বরের বেশি পরিবর্তন হয়েছে, সেগুলো বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম অনুযায়ী ১০ নম্বর পর্যন্ত পরিবর্তনকে স্বাভাবিক পরিবর্তনের আওতায় ধরা হয়। তবে কোনো উত্তরপত্রে ১০ নম্বরের বেশি নম্বর বাড়ানো বা কমানো হলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের মূল্যায়ন পদ্ধতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. ফারুক আহম্মেদ জানিয়েছেন, পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নে যেসব উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তন হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা হবে। শুধু প্রথম পরীক্ষক নন, প্রধান পরীক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বও পর্যালোচনা করা হবে।
সব মিলিয়ে এবারের পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের ফল শুধু কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি দেশের পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি, পরীক্ষকদের দায়িত্বশীলতা এবং বোর্ডগুলোর তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি