
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। প্রতিদিনই বাড়ছে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা। দেশের ৬৪ জেলাতেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এর মধ্যে অন্তত ১০টি জেলায় সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। আক্রান্তের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম, বরিশাল, কক্সবাজার ও সিলেট।
গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত এ রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৭ জনে। একই সময়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০ জন।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকায় হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—মোট ৫৮ হাজার ৬৬৬ জন। এর মধ্যে সন্দেহভাজন রোগী ৪৭ হাজার ৮৬১ এবং নিশ্চিত রোগী ১০ হাজার ৮০৫ জন। এ জেলায় মৃত্যুর সংখ্যাও সর্বোচ্চ, ৪১৪ জন।
আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম। সেখানে সন্দেহভাজন ৭ হাজার ২৮৩ এবং নিশ্চিত ৭৪৪ জনসহ মোট আক্রান্ত ৮ হাজার ২৭ জন। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।
বরিশালে মোট আক্রান্ত ৭ হাজার ২০৮ জন। এর মধ্যে সন্দেহভাজন ৭ হাজার ৬৪ এবং নিশ্চিত রোগী ১৪৪ জন। এ জেলায় মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের। কক্সবাজারে আক্রান্ত ৬ হাজার ৪২০ জন, যার মধ্যে সন্দেহভাজন ৬ হাজার ১৮৯ এবং নিশ্চিত ২৩১ জন। সেখানে মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের।
সিলেটে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৬৯ জন। এর মধ্যে সন্দেহভাজন ৫ হাজার ৭১০ এবং নিশ্চিত রোগী ৩৫৯ জন। এ জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা ৬৪। আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে আরও রয়েছে নোয়াখালী, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা। নোয়াখালীতে মোট আক্রান্ত ৫ হাজার ৮১৯, ফরিদপুরে ৫ হাজার এবং কুমিল্লায় ৪ হাজার ৫০৩ জন।
লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকা, তবু কমছে না সংক্রমণ
হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর জরুরি ভিত্তিতে উচ্চঝুঁকির ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের গণহারে হামের টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি চলে ২০ মে পর্যন্ত।
কর্মসূচির শুরুতে সরকার সারাদেশে অন্তত ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসের ক্যাম্পেইনে প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাবে এতে টিকার কাভারেজ ১০০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।
তবে শুরু থেকেই এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে জুনে একই বয়সী শিশুদের নিয়ে আয়োজিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ কর্মসূচিতে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত শিশুর সংখ্যার হিসাব কতটা সঠিক ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এরপর তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের টিকাদানের অবস্থা যাচাই করা দরকার ছিল।
তিনি মনে করেন, হাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো টিকাদানের প্রকৃত কাভারেজ নিশ্চিত করতে না পারা। হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। এই মাত্রার টিকাদান নিশ্চিত না হলে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো কঠিন।
চিকিৎসা শুরুতে দেরি হলে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের চিকিৎসা সময়মতো শুরু করা যাচ্ছে না, তাদের মধ্যেই জটিলতা ও মৃত্যুর হার বেশি। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা ডা. মো. আতিকুল ইসলাম জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কিছু রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং তাদের কেউ কেউ মারা যাচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে অনেক পরিবার প্রথমদিকে রোগটিকে সাধারণ জ্বর বা অন্য কোনো সংক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে হাসপাতালে নিতে দেরি হয়। এতে চিকিৎসা শুরুতেও বিলম্ব ঘটে এবং জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
হাম কি সরকারের অগ্রাধিকার হারাচ্ছে?
রোগতত্ত্ববিদ ও জাতীয় হাম-রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে হাম সংক্রমণ কমার উল্লেখযোগ্য কোনো লক্ষণ নেই। প্রায় সব বয়সী শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী—বিভিন্ন বয়সের শিশুদের মধ্যেই হাম শনাক্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সংক্রমণ কিছুটা কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তা উল্লেখযোগ্য নয়।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, সরকারি হিসাবে যে ১০৩ শতাংশ টিকাদান কাভারেজের কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। লক্ষ্য নির্ধারণেই যদি অসংগতি থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে কাভারেজের হিসাবও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
এখন কোন এলাকায় এবং কোন বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তার অভিযোগ, হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। অতীতে কোনো টিকাদান ক্যাম্পেইনের পর সংক্রমণ দ্রুত কমে এলেও এবার দীর্ঘ সময় ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। শুরু থেকেই হামকে মহামারি ঘোষণা অথবা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারির দাবি উঠলেও সে ধরনের সর্বাত্মক সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে তিনি মনে করেন।
টিকা সরবরাহেও ছিল জটিলতা
হামের টিকা সরবরাহ নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে নানা জটিলতার কথা উঠে এসেছে। সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন এবং এর পরবর্তী জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফ ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন—গ্যাভির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হামের টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ নিয়ে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে সংসদে বিষয়টি উঠে এসেছে। জরুরি জীবন রক্ষাকারী টিকার ক্ষেত্রে মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি ব্যবহারে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে একাধিক চিঠি এবং বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়টি জানানো হলেও তা যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন দরপত্র পদ্ধতি চালুর পর ফাইল ও কাগজপত্রের প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। আন্তর্জাতিক গুদামে টিকা মজুত থাকার পরও ঢাকা থেকে সময়মতো চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থ ছাড় না হওয়ায় টিকার চালান দেশে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়।
এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে একটি পরিপূরক হাম-রুবেলা বিশেষ ক্যাম্পেইন বাতিল হওয়ায় শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের আওতা আরও কমে যায় বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে টিকা সরবরাহের জটিলতা, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে অসংগতি এবং সংক্রমণ মোকাবিলায় যথেষ্ট দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপের অভাব—এসব বিষয়কে হামের দীর্ঘস্থায়ী প্রাদুর্ভাবের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রকৃত টিকাদান কাভারেজ যাচাই, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টিকাদান এবং আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার ওপরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন তারা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি