
ইরান যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার নিয়ে অত্যন্ত গোপন তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁসের ঘটনায় তদন্তের অংশ হিসেবে দেশটির সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও কমান্ডারকে পলিগ্রাফ বা মিথ্যা শনাক্তকারী পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সিবিএস নিউজ।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তির এবং সীমিত মজুতের কিছু অস্ত্র দ্রুত ব্যবহারের বিষয়ও ছিল। এসব তথ্য খুব অল্পসংখ্যক কর্মকর্তার কাছে সংরক্ষিত ছিল। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।
সাধারণত শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র নবায়নের প্রক্রিয়ায় পলিগ্রাফ পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে। তবে একটি তথ্য ফাঁসের তদন্তে একসঙ্গে এত বেশি কর্মকর্তাকে এই পরীক্ষার আওতায় আনা অত্যন্ত বিরল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কয়েক ডজন কর্মকর্তার পলিগ্রাফ পরীক্ষা
চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে কয়েক ডজন কর্মকর্তার পলিগ্রাফ পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষায় ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং অন্যান্য কমব্যাট্যান্ট কমান্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও ছিলেন।
তাদের জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গভীরভাবে প্রশ্ন করা হয়। পাশাপাশি গণমাধ্যমে গোপন তথ্য ফাঁসের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হয়। তবে তদন্ত সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, তথ্য ফাঁসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে করা প্রশ্নে কেউ পরীক্ষায় ব্যর্থ হননি।
তবে সব শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়নি। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকেও পলিগ্রাফ পরীক্ষা দিতে হয়নি বলে পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
পেন্টাগনের কঠোর অবস্থান
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, অভ্যন্তরীণ কর্মী বা চলমান তদন্তসংক্রান্ত বিষয়ে তারা মন্তব্য করেন না। তবে জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত গোপন তথ্য ফাঁসের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় এবং এ ধরনের ঘটনার তদন্ত করা হয়।
ইরান যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ পর সিবিএস নিউজসহ বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ও সীমিত মজুতের কিছু অস্ত্র দ্রুত ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ করে। এরপর বিষয়টি নিয়ে পেন্টাগনের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়।
যৌথ টাস্কফোর্স গঠন
জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগন ও বিচার বিভাগকে নিয়ে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন। গোপন সরকারি তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
হেগসেথের নির্দেশে পেন্টাগনের জেনারেল কাউন্সেলের কার্যালয়কে তথ্য ফাঁসের ঘটনা তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য, নথি ও সহযোগিতা চাওয়ার ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। পেন্টাগনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসব অনুরোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুই দিনের মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে হেগসেথ বলেছিলেন, গোপন তথ্য ফাঁস হলে তা মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তদন্তে এফবিআই নয়, সামরিক কর্মকর্তারা
শীর্ষ গোপন নথি বা বিশেষ নিরাপত্তা কর্মসূচির তথ্য ব্যবহারের অনুমতিপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের পলিগ্রাফ পরীক্ষা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। নিরাপত্তা ছাড়পত্র পুনর্নিশ্চিত করার সময়ও নির্দিষ্ট বিরতিতে এ পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে।
তবে এবারের পরীক্ষার পরিধি একটি বিশেষ তদন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ তদন্তে এফবিআই জড়িত ছিল না। মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব তদন্তকারীরাই বিষয়টি পরিচালনা করেছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাউন্টারইন্টেলিজেন্স তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এবং এর অংশ হিসেবে পলিগ্রাফ পরীক্ষাও নেওয়া যেতে পারে। তবে কখন ও কীভাবে এ পরীক্ষা নেওয়া যাবে, সে বিষয়ে মার্কিন আইন এবং পেন্টাগনের নিজস্ব বিধিনিষেধ রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরীক্ষাধীন ব্যক্তির সম্মতিও প্রয়োজন হতে পারে।
আগেও পলিগ্রাফ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন হেগসেথ
এর আগে পেন্টাগন থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনায়ও হেগসেথ পলিগ্রাফ ব্যবহারের কথা বলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছর সাবেক জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল সি কিউ ব্রাউনের অপসারণের পর পেন্টাগনে ইলন মাস্ককে নিয়ে চীনের বিষয়ে একটি গোপন ব্রিফিংয়ের তথ্য ফাঁস হয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এ ঘটনায় হেগসেথ তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল ক্রিস্টোফার গ্র্যাডির ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে পলিগ্রাফ পরীক্ষার হুমকি দেন।
তবে গ্র্যাডিকে শেষ পর্যন্ত পলিগ্রাফ পরীক্ষা দিতে হয়নি। একই ঘটনায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডগ সিমসসহ আরও কয়েকজনকে তথ্য ফাঁসের সন্দেহ করা হয়েছিল। পরে সিমসকে চার তারকা জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি এবং গত বছর তিনি অবসরে যান।
ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত ও ব্যবহারের মতো সংবেদনশীল তথ্য কীভাবে গণমাধ্যমে পৌঁছাল, তা বের করতে পেন্টাগনের এই তদন্ত এখন গুরুত্বের সঙ্গে এগোচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো কর্মকর্তাকে তথ্য ফাঁসের জন্য দায়ী করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
স্বদেশ প্রতিদিন/আরএম