
বাংলাদেশের কর্পোরেট দুনিয়া এখন যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাম। বাইরে থেকে আলো ঝলমলে, সুসজ্জিত অফিস, এয়ারকন্ডিশনড পরিবেশ, চকচকে রিপোর্ট সব মিলিয়ে উন্নতির এক মনোহর ছবি। কিন্তু এই মোহময়তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বাস্তবতা: সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিজের সময়, শ্রম, মেধা আর জীবন ঢেলে দেওয়া অসংখ্য কর্মী, যাদের হিসাব প্রতিদিনই মেলে শুধু কাজের খাতা খুললে; কিন্তু বেতন, সুযোগ-সুবিধা, সম্মান এসবের হিসাব কোথাও যেন মিলেই না। কর্পোরেট শ্রমিক যারা প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানের লাভের সিঁড়ি বানায়, তারা আজ বঞ্চনার বুঝি সবচেয়ে বড় শিকার।
এই বঞ্চনার শুরুটাই হয় চাকরিতে যোগদানের মুহূর্তে। চমৎকার একটি নিয়োগ বিজ্ঞাপন, আকর্ষণীয় ইনক্রিমেন্টের প্রতিশ্রুতি আর উন্নতির আশ্বাস! এসব দেখিয়ে তরুণ-তরুণীদের আকৃষ্ট করা হয়। কিন্তু বাস্তবে যোগদানের পরে দেখা যায়, কর্মঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও কাজের চাপ থাকে সীমাহীন। সন্ধ্যা ৬টা অফিস শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ কর্মী বাসায় ফেরেন রাত ৯টা! কেউ কেউ আরও পরে। অথচ ওভারটাইম নেই, নেই আলাদা ভাতা। অনেক সময় দেখা যায়, বেতন কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ন্যূনতম সুবিধাটুকুও পেতে কর্মীকে নানা প্রমাণ দিতে হয়। বেতন বাড়ানোর কথা উঠলেই দেওয়া হয় ‘বাজেট নেই’ ‘ম্যানেজমেন্ট অনুমোদন দেয়নি’ বা ‘চলতি সময়টা কঠিন’ এমন সব অজুহাত। অথচ একই সময়ে প্রতিষ্ঠানের লাভের গ্রাফ থাকে ঊর্ধ্বমুখী, মালিকপক্ষের খাতে বাড়ে বিদেশ ভ্রমণ, নতুন গাড়ি, বাড়তি বিনিয়োগ কিন্তু কর্মীর পকেট থাকে আগের মতোই হালকা।
কর্পোরেট দুনিয়ার আরেক বড় সমস্যা হলো, শ্রমিক বা কর্মীর প্রতি অমার্জনীয় অবহেলা। মিটিংরুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় জুনিয়র কর্মীদের, আবার টার্গেট পূরণ না করলে শুনতে হয় তীব্র তিরস্কার। অথচ সেই টার্গেট অনেক ক্ষেত্রেই হয় বাস্তবতাবিবর্জিত। টার্গেট পূরণের চাপের কারণে অনেক কর্মী দিনে ১০–১২ ঘণ্টা কাজ করেন, কেউ কেউ ছুটির দিনেও অফিসের কল রিসিভ করেন, রিপোর্ট বানান, ই-মেইল পাঠান। বাস্তবে কাজের পরিমাণ যত বাড়ে, বেতন আর স্বীকৃতি তার সামান্য অংশও বাড়ে না। এই অমিলটাই তৈরি করে হতাশা, ক্লান্তি আর মানসিক চাপ যা শেষ পর্যন্ত কর্মীর ব্যক্তিগত জীবনকে পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ করে।
অন্যদিকে, কর্পোরেট ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আরও এক অদ্ভুত মানসিকতা প্রকাশ পায়- কর্মীকে ‘রিসোর্স’ হিসেবে দেখা। যেন মানুষ নয়, যান্ত্রিক সম্পদ; প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে, কাজ শেষ হলে বদলে ফেলা হবে। এ কারণেই দেখা যায়, ৬ মাস কাজ করেই অনেক কর্মী চাকরি বদলে দেন। কর্মী ধরে রাখার নীতিমালা নেই, নেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দক্ষ জনবল তৈরি করতে যে বিনিয়োগ দরকার, সেটিও করা হয় না। অথচ দেশের উন্নতমানের কোম্পানিগুলো জানে, দক্ষ জনবলই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ। তাদের সন্তুষ্টি মানেই উৎপাদনশীলতা, আর উৎপাদনশীলতা মানেই লাভ। কিন্তু বাংলাদেশের কর্পোরেট কালচারে এখনো এই বোঝাপড়ার অভাব প্রকট।
কর্পোরেট কর্মীদের আরেকটি বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে, তাদের অধিকাংশ কাজই ‘অদৃশ্য’ পরিশ্রমের দৃশ্যমান প্রমাণ নেই, তাই মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও থাকে নানা বাঁধা। একটি রিপোর্ট তৈরিতে যে রাতজাগা পরিশ্রম লাগে, একটি ক্যাম্পেইন সফল করতে যে পরিকল্পনা ও দৌড়ঝাঁপ করতে হয়, একটি প্রেজেন্টেশনের পেছনে যে ঘাম ঝরে তা অনেক সময়ই চোখে পড়ে না ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। তারা দেখেন ফলাফল, কিন্তু দেখেন না শ্রম; দেখেন ভুল, কিন্তু দেখেন না প্রয়াস। এই অসম সম্পর্কই তৈরি করে কর্মক্ষেত্রে হতাশা ও ক্ষোভ।
কথা হচ্ছে- এই বঞ্চনার দায় কার? মালিকপক্ষের? নাকি পুরো কর্পোরেট নীতিমালার? নাকি সমাজের এমন মানসিকতা, যেখানে মনে করা হয় অফিসের মানুষ মানেই পরিপাটি, সচ্ছল, আরামদায়ক জীবন যাপনকারী? বাস্তবতা হলো- কর্পোরেট কর্মীদের বড় একটি অংশ প্রতিমাসে বেতন মেলে কি না, বাড়ি ভাড়া দিতে পারবেন কি না, সন্তানের ফি দিতে পারবেন কি না এসব হিসাবই মিলিয়ে রাত কাটান। তাদের ঘরে আলো জ্বলে থাকে শুধু প্রয়োজনের কারণে, স্বপ্নের কারণে নয়।
এখন প্রশ্ন আসে- সমাধান কোথায়?
প্রথমত, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। একটি প্রতিষ্ঠান যত বড়ই হোক, কর্মীর ন্যায্য প্রাপ্যটাই হতে হবে তার মূল শক্তি।
দ্বিতীয়ত, কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করালে ওভারটাইম দিতে হবে এটি শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি আইনি বাধ্যবাধকতা।
তৃতীয়ত, কর্মী মূল্যায়ন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ; আপনি কাকে কতটা মূল্য দিচ্ছেন, তা কর্মী যেন বুঝতে পারেন।
চতুর্থত, পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট যেন কারো ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও বাস্তব অবদানই হবে প্রধান বিবেচনা।
সবশেষে, আমাদের সমাজকেও বুঝতে হবে কর্পোরেট দুনিয়ার চাকচিক্যের আড়ালে যে পরিশ্রম লুকিয়ে আছে, সেটি কোনো অংশে কম নয়। এই মানুষগুলো দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়, কর দেয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। তাদের প্রতি অবহেলা মানে দেশের অগ্রগতিকেই আটকে দেওয়া।
সত্যিটা হলো- সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শ্রমের হিসাব প্রতিদিনই মিলে যায়, কিন্তু মজুরির হিসাব মেলে না। এই অমিলের অবসান না হলে শুধু কর্মী নয়- প্রতিষ্ঠানও হারাবে তার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা, আর দেশ হারাবে একটি বিশাল, কর্মঠ, স্বপ্নবান কর্মশক্তি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
স্বদেশ প্রতিদিন/ এমএস