বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
টাঙ্গাইল সেতুর প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ      মিছিলের চেষ্টা, ছাত্রলীগের ২০ নেতাকর্মী আটক      এনসিপি নেতাদের গণধোলাই দিতে হবে: এমদাদ চৌধুরী      ৬৮ লাখ টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করেছে বিজিবি      ৪২ বোতল বিদেশি মদসহ আটক ৩      বিগত সরকারের সময়ে কুইক রেন্টালের নামে লুটপাট হয়েছে : ড. এম এ কাইয়ুম      আজ জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী       নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভোট নয়, জানুয়ারিতে স্থানীয় নির্বাচন: ইসি      বিশ্ববাজারে আরও বাড়ল তেলের দাম      ‘বাকেরের ফাঁসি’ ঠেকাতে রাস্তায় নেমেছিল মানুষ      মানুষ ও প্রাণীর নীরব বন্ধনের গল্প ‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’-এ      শুধু শিক্ষিত হলেই হবে না, দায়িত্বশীল হতে হবে: ডেপুটি স্পিকার      
নারীদের অফিস টাইম পাঁচ ঘণ্টা করার যুক্তিসঙ্গত ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ
এইচ এম জোবায়ের
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫, ৪:২০ পিএম আপডেট: ১৮.১১.২০২৫ ৪:৩৩ PM
এইচ এম জোবায়ের

এইচ এম জোবায়ের

কর্মজীবী নারীদের পরিবার ও সমাজে দ্বৈত দায়িত্ব পালন করতে হয়, এই বাস্তবতা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। বাংলাদেশের নারীরা চাকরি করার পাশাপাশি পরিবার ও সন্তান ব্যবস্থাপনা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবা, ঘর-সংসার, সবকিছু সামলে থাকেন। বর্তমান আট-দশ ঘণ্টার অফিস টাইমের সঙ্গে যাতায়াত মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় এগারো-বারো ঘণ্টা কর্মক্ষেত্রসংক্রান্ত সময় দিতে হয়। তাই নারীদের অফিস টাইম পাঁচ ঘণ্টা করলে পুরো সমাজ একটি বাস্তব সমস্যার সমাধানমুখী উদ্যোগ পাবে বলে মনে করছেন সচেতন ও মানবিক রাজনীতিবিদগণ।

তাদের মতে, নারীদের কিছুটা কম কর্মঘণ্টার মাধ্যমে সামাজিক মূল্যবোধ শক্তিশালী হবে। আর মজবুত পরিবার একটি সুস্থ জাতির ভিত্তি গড়ে দেয়। নারীদের পরিবারে বেশি সময় দিতে দিলে, পারিবারিক বন্ধন, নৈতিক মূল্যবোধ, সুশিক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়বে। এটি শুধু নারীর নয়, পুরো সমাজের উপকারে আসবে। কর্মক্ষেত্রে নারী-বান্ধব নীতি দেশের ইমেজ বাড়াবে। নারীদের জন্য নমনীয়, মানবিক ও পরিবারবান্ধব কর্মনীতি থাকলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী-ক্ষমতায়ন মডেল হিসেবে পরিচিত হতে পারে। বৈশ্বিক জেন্ডার সমতা সূচকে অবস্থান উন্নত হবে। এতে দেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়বে। বাংলাদেশের নারীবান্ধব এই উদার নীতি পৃথিবীর বহু দেশ গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি আরও কিছু ইতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারীভাবে সমাজে পড়বে, নিচে তা তুলে ধরা হলো।

শিশু ও পরিবার লালন-পালনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। শিশু লালন-পালনের জন্য শূন্য থেকে আট বছর পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে শিশুর যত্নে মায়েদের বাড়তি সময়ের প্রয়োজন। শিশু প্রতিপালনে মায়ের বাড়তি সময়, শিশুর মানসিক বিকাশ, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা, সুরক্ষা, আত্মবিশ্বাস গঠন ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে ভবিষ্যতে সুস্থ, মানবিক ও নৈতিক প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

এ নীতিতে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। বাংলাদেশে কর্মক্ষম নারীদের মাত্র ৩৭% শ্রমবাজারে যুক্ত (এশিয়ার মধ্যে কম)। দীর্ঘ অফিস টাইম, সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে না পারায় অনেক নারীকেই চাকরি ছাড়তে হয়। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা অফিস হলে নারীদের চাকরিতে আগ্রহ বাড়বে, চাকরি ছাড়ার হার কমবে, “মা হলে ক্যারিয়ার থেমে যায়”, এই বাধা কমবে, সর্বোপরি অর্থনীতি উপকৃত হবে।

নারীদের কম কর্মঘণ্টায় মানসিক চাপ কমে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের সময় কম হলে উৎপাদনশীলতা কমে না, বরং বাড়ে। তাই পাঁচ ঘণ্টা বা কিছু কম-বেশি কর্মঘণ্টা হলে ‘বার্নআউট’ কমবে। বেশি সময় কাজ করলে মানসিক ক্লান্তি বাড়ে, ভুল বেশি হয়। কম সময় কাজ করলে উল্টো ফল ভালো হয়। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে, মনোযোগী ও কার্যকর কাজ পাওয়া যাবে। “যথাসম্ভব কম সময় কাজ করে বেশি ফল পাওয়া”, এই আধুনিক কর্মমডেল কার্যকর হতে পারে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মঘণ্টা কমিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। যেমন ডেনমার্ক ও সুইডেনে ছয় ঘণ্টার কর্মদিবস; আইসল্যান্ড দুই বছর পরীক্ষা করে দেখেছে কম ঘণ্টায় আউটপুট বেড়েছে; জাপানে মাইক্রোসফট চার দিনের ওয়ার্কউইক চালু করে ৪০% উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে; যুক্তরাজ্যের চার দিনের ওয়ার্কউইক ট্রায়ালে ৯২% কোম্পানি ইতিবাচক ফল পেয়েছে। সুতরাং কর্মঘণ্টা কমালে মালিকপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ ধারণা অমূলক। তবে বাস্তব জরিপে যদি দেখা যায় নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোয় শিল্পমালিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, তাহলে সে দায় সরকার নেবে এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।

অনেক দেশে নারীদের মধ্যে পার্ট-টাইম কাজের হার তুলনামূলক বেশি, ফলে গড়ে তাদের কাজের ঘণ্টা পুরুষের তুলনায় কম। আইএলওর তথ্যমতে, নেদারল্যান্ডসে প্রায় ৬০% নারী পার্ট-টাইম কাজে যুক্ত। সুইজারল্যান্ডেও প্রায় ৪৫% নারী সপ্তাহে ত্রিশ ঘণ্টা বা তার কম কাজ করেন।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বিখ্যাত উক্তি, “আমাকে একজন আদর্শ মা দাও, আমি তোমাকে আদর্শ জাতি দেব” বাণীটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বারো-চৌদ্দ ঘণ্টা কর্মস্থলে সময় দিয়ে বেশিরভাগ নারীর পক্ষে আদর্শ সন্তান প্রতিপালন সম্ভব নয়। ‘শিক্ষা ও সার্টিফিকেট অর্জন শুধু চাকরির জন্য’ এই ধারণাও সর্বজনীন সত্য নয়। এই ব্যাখ্যা আমাদের সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নারী সমাজের বড় একটি অংশকে প্রয়োজনের বাইরে চাকরিমুখী করা হয়েছে। কর্মস্থলে সঠিক পরিবেশ, পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা, নিরাপত্তা এসব নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। এখানে একটি দুরভিসন্ধির সুযোগও রয়েছে, কম বেতনে নারীদের শ্রমে লাগানো ও অধিক কাজ করানো। অর্থাৎ বিষয়টি এমন তোমাদের চাকরি করতেই হবে, তবে মালিক যা বলবে তাই মানতে হবে। এটি এক ধরণের ধূর্ততা ও ছলচাতুরি।

ইসলাম এবং ইসলামী দলগুলোর বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। তারা নারীদের প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত করে সত্যিকারের বৈষম্য দূর করার কথাই বলেছেন। সন্তান গর্ভধারণের কষ্ট, প্রসববেদনা, দুই বছর পর্যন্ত দুধ পান করানোর শারীরিক পরিশ্রম, এসবের পাশাপাশি পুরুষের সমান কর্মঘণ্টা নারীদের দিতে বাধ্য করা সুস্পষ্ট জুলুম। মায়েদের ওপর জুলুম করে কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারে না। তাই দেশের সচেতন মানুষকে এই দাবির পক্ষে জনমত তৈরি করে এক প্ল্যাটফর্মে সমবেত হওয়া প্রয়োজন।

লেখক: সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক


স্বদেশ প্রতিদিন/এমএএম



আরও সংবাদ   বিষয়:  অফিস টাইম   পাঁচ ঘণ্টা  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close