
রাজশাহীতে দায়রা জজ মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের ছেলে তাওসিফ রহমান সুমন হত্যাকাণ্ডে নতুন রহস্যের জন্ম দিয়েছে অভিযুক্ত লিমন মিয়ার বক্তব্য। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি দাবি করেছেন, ঘটনাটি একটি “উল্টাপাল্টা সাজানো নাটক” এবং তিনি নাকি “একটি ভালোবাসার ভুল বোঝাবুঝির শিকার।”
লিমন মিয়া (সেনা নম্বর ১২৩২৮০৯) নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর পিতা এইচ এম সুলাইমান গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়ভাবে ‘জিয়া সাইবার ফোর্স’-এর জেলা কমিটির সদস্য বলে দাবি করেন লিমন।
হাসপাতালে সাংবাদিকদের রেকর্ড করা বক্তব্যে লিমন বলেন, “তাসমিন নাহার লুচি—যিনি বিচারকের স্ত্রী—তার সঙ্গে আমার পাঁচ বছরের সম্পর্ক ছিল। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমাদের পরিচয়। প্রথমে উনি রাজি ছিলেন না, পরে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। বিয়ের প্রস্তাব দিলেও তিনি রাজি হননি। আমি ভয় পেতাম, একদিন উনি জজের ক্ষমতা দিয়ে আমাকে মামলায় ফাঁসিয়ে দেবেন।”
তাঁর দাবি, তাসমিনের আগেও মাসুদ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পর্ক ছিল। “আমি জানতাম, কিন্তু ভালোবাসা থামাতে পারিনি,” বলেন লিমন।
সম্প্রতি তিনি গোলাপ ফুল, বাদাম ও পপকর্ন নিয়ে তাসমিন নাহারের রাজশাহী বাসায় যান। “তাসমিনের জামাই আমাকে মেসেঞ্জারে ডেকে বলেন, আয় প্রমাণ দেখা। আমি গেলে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দিয়ে আমাকে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে যায়, ২৪ ঘণ্টা আটক রাখে। কোর্ট থেকে জামিন পাই।”
লিমনের দাবি, ঘটনার দিনও তিনি তাসমিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। “আমি কথা বলতে গিয়েছিলাম, উনি পাশের রুমে গিয়ে পুলিশে খবর দেন। দরজা ভাঙার সময় আমি রেগে যাই। হাতে চাকু ছিল, হাতেই ১–২টা লাগে। তাঁর ছেলে এসে আমাকে মারতে থাকে। আমি আত্মরক্ষায় ছেলের পায়ে কামড় দিই। মাথা বা পেটে আঘাত করিনি—ও মারা যাওয়ার কথা না,” বলেন লিমন।
তিনি আরও বলেন, “আমার এয়ারটেল নম্বরের কললিস্ট দেখলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার প্রমাণ পাওয়া যাবে। তাঁর ব্যাগে আমার সেনা সার্টিফিকেট ও ২৪ জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের সনদও আছে। আমি চাই, সত্যটা দেশবাসী জানুক। আমি অপরাধী হলে আমার ফাঁসি হোক, কিন্তু ওরা অপরাধী হলে তাদেরও শাস্তি হোক।”
লিমন তাসমিনের উদ্দেশে বলেন, “লুচি, তুমি আমাকে গুলি করো, তবুও আমি বলব—তোমাকে ভালোবাসি। তুমি ফাঁসি দিলে আলহামদুলিল্লাহ, আমি মৃত্যুকেও জয় করেছি।”
তবে এই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবু সুফিয়ান সাংবাদিকদের সতর্ক করে বলেন, “হেফাজতে থাকা অভিযুক্তের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যাচাই না করে এসব বক্তব্য প্রচার করা ঠিক নয়। তদন্তে ব্যক্তিগত সম্পর্কসহ সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের ছেলে তাওসিফ রহমান সুমন (১৬) গত সপ্তাহে নিজ বাসায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন। এ সময় বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী গুরুতর আহত হন। স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে হামলাকারী লিমন মিয়াকে পুলিশ হেফাজতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এই ঘটনাকে ঘিরে পুরো রাজশাহীজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। লিমনের কথিত প্রেম, সেনা পরিচয় ও হত্যার রহস্য ঘিরে জনমনে উঠছে নানান প্রশ্ন— ভালোবাসা নাকি প্রতারণা, আত্মরক্ষা নাকি পরিকল্পিত খুন? উত্তর এখন তদন্তের অপেক্ষায়।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ