
কাঞ্চনজঙ্ঘা
খুব বেশি দিন হয়নি গভীর চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার। ঘুম ভাংলেই গেরস্থালী কাজ, ভোরে হাটতে হাটতে সামান্য নজরে দেখা হতো আকাশচুম্বী পৃথিবীর সুউচ্চ পাহাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা। যুগযুগ ধরে ষড়ঋতুর শরৎ-হেমন্তে উত্তরের পরিস্কার আকাশে নীল আভায় মায়াবি রূপ ছড়িয়ে প্রকৃতিকে মোহনীয় করে যাচ্ছে বরফের পাহাড়। তা জানা ছিল না খোদ স্থানীয় উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়ের বেশি সংখ্যক মানুষের। বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে নিয়ে প্রতিবেদন করায় পর্যটকদের আগমনী ভিড় দেখে টনক নড়েছে স্থানীয়দের। তাই তো কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড় ঘিরে পর্যটন শিল্পে যোগ হয়েছে নতুনমাত্রা। গড়ে উঠছে নতুন আবাসিক, রিসোর্ট, হোটেল-রেস্তোরার মতো বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র ও পর্যটক সেবা প্রতিষ্ঠান।
বুধবার সকালে নিজ এলাকায় মহাসড়কের ধারে ধানক্ষেতে ফ্যামেলি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখছিলেন ব্যাংকার সিরাজুল ইসলাম। তিনি তার শিশু সন্তানকে হাত নেড়ে দেখাচ্ছিলেন পাহাড় চূড়ার দৃশ্য। স্থানীয় হয়েও এভাবে পরিবার নিয়ে পাহাড় দেখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না তিনি। তিনি জানান, তেঁতুলিয়াতেই আমার বাসা। ভোর সকালে আমার ফ্যামেলিকে নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখলাম। অসাধারণ। যদিও প্রায়ই দেখা হয়, কিন্তু আজকের অনুভূতিটা প্রকাশের মতো নয়। আমি আমার ছেলেকে দেখাচ্ছিলাম।
স্থানীয়রা বলছেন, নিত্যদিনের দিনের মতোই তাদের ভোর সকালে ঘুম ভাঙ্গে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েন। কৃষিভিত্তিক এলাকা হওয়ায় ভোর সকালে ব্যস্ততা বেড়ে যায় কৃষিকর্মে। কেউ ধান ক্ষেতে, কেউ চা বাগানে, কেউ সবজি ক্ষেতে এভাবে যে যার পেশায় নিভৃত হয়ে যান তারা। আবার সকালে জানালার কাছে, বাইরে বসে চায়ের চুমুকে নজর পড়ে উত্তরের সুনীল আকাশে ভেসে উঠা পাহাড়ের দৃশ্যে। কিন্তু কে জানতো এ পাহাড় দেখতে অগণিত মানুষ ছুটে পাহাড়ের দেশে হিমালয়কন্যা নেপালে। সেই নেপালের পাহাড় চূড়া দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তেঁতুলিয়া ভিড় করে হাজার হাজার মানুষ।
সাইফুল ইসলাম জানান, সীমান্ত প্রবাহিত মহানন্দা নদীর পাশেই আমার বাড়ি। যুগযুগ আমরা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে আসলেও এটা নিত্যদিনের অভ্যাস। তবে কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘিরে মানুষ এ অঞ্চলে প্রচুর পর্যটক ঘটবে এমন ধারণা ছিল না আমাদের। অথচ আমরা প্রতিদিন সকালে নদীতে চলে আসে। পাথর ব্যবসা করায় নদীতে শ্রমিকরা পাথর উত্তোলন করায় এখানে বেশি সময় কাটাই। এখান থেকে দেখি নদীর জলের উপর পাহাড় হাসছে। কিন্তু এ অনুভূতি এখন জাগছে পর্যটকদের দেখার কারণে। আল্লাহর সৃষ্টি সত্যিই অপূর্ব। এখন যতোই দেখি ততোই মুগ্ধ হই।
স্থানীয় ফুটবলার সাজেদার রহমান রাজু জানালেন, আমরা স্থানীয় হিসেবে প্রায়ই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে থাকি। এটি আমাদের নিত্যদিনের দর্শন। আমাদের থেকে এটি পর্যটকদের কাছে বেশি আগ্রহের। আমরা পর্যটকদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি একমাত্র তেঁতুলিয়া এমন একটা জায়গা, যেখানে বিনে পয়সায় বিনা পাসপোর্ট ভিসায় দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তাই পর্যটকরা আসুন, এসে উপভোগ করুন।
কাঞ্চনজঙ্ঘা হচ্ছে পৃথিবীর তৃতীয় এবং হিমালয় পর্বতমালার দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। এটি ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা প্রায় ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট বা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার। কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে চারটি নদীর উৎপত্তি ঘটেছে। নদীগুলি বাংলাদেশেও প্রবাহিত হয়। এখান থেকে এভারেস্ট শৃঙ্গের দূরত্ব কাছে থাকায় খুব কাছ থেকে দেখা মেলে অপরূপ সৌন্দর্যের মায়াবী কাঞ্চনজঙ্খা।
ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে উত্তরের জেলা পঞ্চগড় প্রতিবেশি হিমালয়ের দেশ নেপাল বেশি দূরে নয়। তারচেয়ে নিকটে তিনদিক থেকে কাটাতারে ঘিরে রাখা ভারত। এ অঞ্চল থেকে নেপালের মাউন্ট এভারেস্ট হিমালয়ের দূরত্ব প্রায় একশো কিলোমিটার। কাঞ্চনজঙ্ঘা দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার। ভারত-নেপালের অতি নিকটে অবস্থান হওয়ায় পৃথিবীর সুউচ্চ পাহাড় হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান হয়ে উঠে যেন অতি নিকটে। এ দ্যুতি দেখা মেলে ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী তিস্তার পাড় থেকেও। তবে অতি কাছ থেকে দেখতে হলে ছুটে যেতে হবে তেঁতুলিয়াতেই।
বিগত কয়েক বছর ধরে ভোর সকালে উত্তরের আকাশ জুড়ে মায়াবী রূপ নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখে অবাক হয়ে যান স্থানীয়রাও। যদিও যুগযুগ ধরে সকালের ঘর গৃহস্থালী কাজ করতে গিয়ে, ঘরের জানালায় চায়ের চুমুকে দেখে আসছেন স্থানীয়রা। কিন্তুপর্যটকদের মতো সেভাবে গভীর দর্শনে এ মায়ারূপের কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ভাবেননি তারা। নিত্যদিনের জীবনের ছায়ালিপি হলেও প্রকৃতি প্রেমিদের কাঞ্চনজঙ্ঘার জাদুকরীর মায়ায় টানছে মুগ্ধ করছে এ অঞ্চলের মানুষদেরও। তারাও এখন ভোর সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেই পর্যটকদের জানাতে তাদের স্মার্টফোনের ক্যামেরায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিকযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন। সোস্যাল মিডিয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার খবর পেয়ে ছুটে চলেন পর্যটকরা। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ প্রেমিক-প্রেমিকা, কেউ নব-দম্পতি কিংবা বন্ধু সার্কেল নিয়ে ছুটেন পাহাড়ের আকর্ষনে।
পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থান হতে দেখা মেলে মোহনীয় রূপশ্বৈর্য নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা। সমতলের চায়ের বুকে, নদীর বুকে, সবুজের ধানের ক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থান থেকে দেখা মেলে এ শ্বেতশুভ্র পাহাড়ের মায়ারূপ। ভোরের আলো মেখে জাগতে শুরু করে সে। তারপর ক্ষণে ক্ষণে রং পালটাতে থাকে। ভোরের সূর্যের আভা ছড়িয়ে পড়লে কাঞ্চনজঙ্খা হয়ে ওঠে লাল টকটকে। দিন পেরোনোর সঙ্গে রং বদলাতে থাকে তার। কমলা, তারপর হলুদ আবার সাদা। অপার সৌন্দর্যের বিস্তৃত ঘটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয় হাসছে পাহাড়। তার শরীর ঘেঁষে চলে গেছে বিস্তৃত হিমালয়। সবুজ ও কালো রং মেখে হিমালয়ও হয়ে ওঠে অপরূপ। ছবির মতো ভেসে ওঠা শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য ছাড়াও দেখা মেলে প্রতিবেশী দেশ ভারতের দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চল। জলবায়ু ও আবহাওয়ার কারণে কারও ভাগ্যে জুটে পাহাড় দেখার, কেউ নিরাশ হয়ে ফিরে আবার দেখতে ছুটে আসেন উত্তরের পাহাড় দেখার প্রাকৃতিক অপরূপ লীলাভূমিতে।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেয়ে অনেক খুঁশি অনিন্দিতা রায় নামের এক পর্যটক। তিনি জানান, অনেক দূর থেকে এসেছি। এসেই স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেয়ে। এমন ঝকঝকে নীল আকাশে ভেসে উঠা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাব কল্পনাই করিনি। কেননা আমার অনেক ফ্রেন্ডসার্কেল এই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এসে না দেখতে পেয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে গেছে তারা। আমি খুবই সুভাগ্যবান যে দেখতে পেলাম।
একই কথা বলেন নীলফামারী থেকে আসা সোহেল স্বপন। তিনি জানান, কয়েকদিন ধরেই অবস্থান করছিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য। আজ দেখতে পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। আসলে কাছ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া অনুভূতিটাই আলাদা। খুবই ভালো লাগছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সাদিয়া গিফট কর্ণারের পরিচালক হাফিজুর রহমান হাবিব তিনি একজন সংবাদকর্মীও। ডাকবাংলোর পিকনিক কর্নারে তার সাদিয়া গিফট কর্ণার নামের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনি জানালেন, পর্যটকদের সেবা নিয়োজিত রয়েছি। যখনই কোন পর্যটক সমস্যা কিংবা তথ্য জানতে চান, দ্রæত তথ্য দিয়ে থাকি। আর যখনই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় দ্রুত ফেসবুকের মাধ্যমে জানিয়ে দেই। এখানে অনেক ট্যুরিস্ট ও স্থানীয়রাও চায়ের চুমুকে চুমুকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অনুভূতি উপভোগ করে থাকেন।
কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘিরে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের পর্যটন শিল্পে যোগ হয়েছে ভিন্নমাত্রা। পর্বত ভারত-নেপালের সীমান্তে অবস্থান থাকলেও সেখান থেকে মায়ার সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। কাছের তুলনায় দূরের দৃশ্য যেন বেশি আকর্ষণের। তাই তো বিনাপাসপোর্টে ভারত-নেপালে না গিয়েই তেঁতুলিয়া হতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা দেখা যাওয়ায় পর্যটন অঞ্চল হিসেবে সমৃদ্ধ হয়েছে জেলাটি। এ অঞ্চলের পর্যটন স্পট ডাকবাংলোর পিকনিক কর্ণার ও মহানন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দেখা যায় রূপশ্বৈর্য পর্বতমালা কাঞ্চনজঙ্ঘা। এসব স্পটসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা দেখছেন, ছবি তুলছেন ও ভিডিও করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতশৃঙ্গ ও পর্যটন ঘিরে গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারিভাবে আবাসন ব্যবস্থা। গড়ে উঠেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ জোন, তেঁতুলিয়া ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম, ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন পঞ্চগড়, নর্থ বাংলা ট্যুরিজমসহ বেশ কয়েকটি পর্যটক সেবা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো বলছেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘিরে দিন দিন বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে আবাসিক, চা বাগানে রিসোর্ট, কাঠের বাড়ির মতো আবাসিক গড়ে উঠছে। এখানকার ভ্যান চালক, হোটেল-রেস্তোরাগুলো পর্যটন সময়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেন পর্যটক সেবা দিতে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক কেএম আজমিরুজ্জামান জানান, দেশের পর্যটনের অন্যতম অঞ্চল হচ্ছে উত্তরের পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া। আমরা পর্যটকদের জন্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের কন্টাক্ট নম্বরগুলি বিভিন্ন জায়গায় বিল বোর্ডেও প্রদর্শন করেছি। যাতে যে কোনো প্রয়োজনে পর্যটকরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। জরুরি ফোন এলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজ শাহীন খসরু জানান, পঞ্চগড় তেঁতুলিয়া একটি পর্যটন এলাকা। এখান থেকে খুব কাছ থেকে হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। পর্যটকদের জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, তার জন্য আমরা সার্বক্ষণিক সচেষ্ট আছি।
স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ