
সংগৃহীত ছবি
দেশের শিল্পখাতের মন্দা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংক এখন শিল্পঋণের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটি—বিশেষ করে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে—বিনিয়োগে মনোনিবেশ করছে। ব্র্যাক ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল), ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবং প্রাইম ব্যাংক এই পরিবর্তনের সুবিধা ভোগ করছে এবং তাদের লাভের হার তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অদ্ভুত হলেও সত্য, এই মুনাফার ঊর্ধ্বগতি ঘটেছে এমন সময়ে, যখন অধিকাংশ ব্যাংকের নিট সুদ আয় (NII) কমেছে। এর মূল কারণ হলো সরকারি সিকিউরিটিকে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধ আচরণ উদ্বেগজনকভাবে দুর্বল, এবং খেলাপি ঋণের (NPL) হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো শিল্পঋণের চেয়ে সরকারি যন্ত্রে বিনিয়োগকেই বেশি স্থিতিশীল ও নিরাপদ আয়ের উৎস মনে করছে।
উল্লেখযোগ্য যে, সম্প্রতি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা হয়েছে। যদিও এসব বিনিয়োগে লাভের মার্জিন খুব বেশি নয়, ব্যাংকগুলো এটিকে তাদের পোর্টফোলিওকে নিরাপদ রাখার উপায় হিসেবে গ্রহণ করছে। তবে এই প্রবণতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। রেপো রেটের যে কোনো পরিবর্তন মুদ্রাস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া, যেহেতু অধিকাংশ ব্যাংক আমানত স্বল্পমেয়াদি, তাই জনসাধারণের আমানতের প্রবাহও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকগুলোর মুনাফা আসে মূলত আমানতের খরচ ও বিনিয়োগ বা ঋণ থেকে প্রাপ্ত সুদের ব্যবধান (spread) থেকে। যদি আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে, ব্যাংকগুলোকে উচ্চ হারে এসডিএফ (SDF) বা কলমানি বাজার থেকে তহবিল ধার করতে হবে, যা তাদের লাভের মার্জিন আরও সংকীর্ণ করবে।
অগ্রিম-আমানত (AD) অনুপাত বজায় রাখাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়তে পারে। সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ হলেও এটি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি অস্থায়ী ও অস্থিতিশীল উপায়। নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা বেশি। বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়, এবং মুদ্রাস্ফীতি ব্যাংকিং খাতের আমানত প্রবাহকে প্রভাবিত করবে।
এই অবস্থায়, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগকে দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্পে পুনর্নির্দেশ করা জরুরি। খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমাতে কিছু নির্দিষ্ট খাতের জন্য সুদের হার সীমা নির্ধারণ (interest band) করা যেতে পারে। তাছাড়া, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হওয়ায়, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়ানো দরকার, যাতে উৎপাদনশীলতা চাহিদার সঙ্গে খাপ খায়।
দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর জন্য নিরাপদ মুনাফা নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে দেশের জিডিপি বা সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সমান হারে হবে না। তাই, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোই ভবিষ্যতে বেশি মুনাফা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ সুগম করবে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ