
বরফে ঢাকা আলাস্কার দুর্গম প্রান্তর। চারদিকে তীব্র ঠান্ডা, জনমানবহীন পাহাড় আর বন্যপ্রাণীর ভয়। বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের পাশে গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে আছেন সাবেক স্পেশাল ফোর্সেস কর্মকর্তা জেমস বেলমন্ট। পাশে একমাত্র সঙ্গী অবসরপ্রাপ্ত যুদ্ধকুকুর ওডিন। লোকালয়ে ফিরতে হলে তাদের পাড়ি দিতে হবে প্রায় ৫৮ মাইলের দুর্গম পথ। শুরু হয় বেঁচে ফেরার এক অসম লড়াই।
এমন গল্প নিয়েই নির্মিত হয়েছে ব্র্যাড পিট অভিনীত সিনেমা ‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’। তবে এটি শুধু দুর্গম প্রকৃতির সঙ্গে টিকে থাকার গল্প নয়। যুদ্ধের ক্ষত, নিঃসঙ্গতা, অতীতের ট্রমা এবং মানুষ ও প্রাণীর গভীর বন্ধনও সিনেমাটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ছবিতে জেমস বেলমন্ট চরিত্রে অভিনয় করেছেন ব্র্যাড পিট। মার্কিন সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সেসের সাবেক এই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানোর পর অবসর নিয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ওডিন নামের একটি প্রশিক্ষিত যুদ্ধকুকুর। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ওডিনের মধ্যেও রেখে গেছে গভীর ছাপ।
জেমস ও ওডিন—একজন মানুষ, অন্যজন প্রাণী। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে অদ্ভুত মিল। দুজনই যুদ্ধ দেখেছে, আঘাত পেয়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। দুর্গম আলাস্কায় আটকা পড়ার পর তাদের পারস্পরিক নির্ভরতা আরও গভীর হতে থাকে।
গল্পের শুরু আলাস্কার আকাশে। সিপ্লেন নিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন জেমস। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিমানটি দুর্গম বরফাঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়। গুরুতর আহত জেমসের সামনে তখন দুটি পথ—সাহায্যের অপেক্ষায় থাকা অথবা আহত শরীর নিয়েই লোকালয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় পথই বেছে নেন তিনি।
প্রায় ৫৮ মাইলের এই পথ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সহজ নয়। তার ওপর চারদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়, হিমশীতল বাতাস, সীমিত খাবার ও সরঞ্জাম। সঙ্গে রয়েছে বন্যপ্রাণীর হুমকি। নেকড়ে কিংবা ভালুকের মতো শিকারি প্রাণী যেকোনো সময় সামনে চলে আসতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ওডিনের সামরিক প্রশিক্ষণ এবং স্বাভাবিক প্রাণীসুলভ প্রবৃত্তি জেমসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কখনো সে বিপদের আগাম আভাস দেয়, কখনো জেমসকে সতর্ক করে, আবার কখনো সরাসরি বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে রক্ষা করে। একপর্যায়ে ওডিন শুধু জেমসের সঙ্গী নয়, তাঁর রক্ষকও হয়ে ওঠে।
ছবিটির আবেগঘন দিকটি তৈরি হয়েছে জেমস ও ওডিনের এই নীরব বোঝাপড়াকে কেন্দ্র করে। তাদের মধ্যে মানুষের মতো কথোপকথন নেই। তবু বিপদের মুহূর্তে একজন আরেকজনের ওপর নির্ভর করে। একজনের শক্তি কমে গেলে অন্যজন তাকে এগিয়ে নেয়। একজন বিপদে পড়লে অন্যজন পাশে দাঁড়ায়। বরফের মধ্যে যাত্রা যত দীর্ঘ হয়, তাদের সম্পর্কও তত গভীর হতে থাকে।
সম্প্রতি সিনেমাটির দুটি ট্রেলার প্রকাশ হয়েছে। প্রথম ট্রেলারে গুরুত্ব পেয়েছে বিমান দুর্ঘটনা, আলাস্কার ভয়ংকর প্রকৃতি এবং বেঁচে থাকার লড়াই। দ্বিতীয় ট্রেলারে জেমস ও ওডিনের সম্পর্ক এবং একে অপরকে হারানোর ভয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ট্রেলারের ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘স্ট্যান্ড বাই মি’ গানের একটি কভার সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে সিনেমাটির আবেগ আরও তীব্র হয়েছে। নেকড়ের আক্রমণসহ বিভিন্ন বিপদের মধ্যে ওডিনকে জেমসকে রক্ষা করতে দেখা যায়।
‘হার্ট অব দ্য বিস্ট’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ব্র্যাড পিট ও পরিচালক ডেভিড আয়ারের পুনর্মিলন। এর আগে যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘ফিউরি’তে তারা একসঙ্গে কাজ করেছেন। ‘ফিউরি’র মতো এ সিনেমায় সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র নেই। তবে যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে প্রধান চরিত্রের মনে। ফলে যুদ্ধ ও সামরিক জীবন নিয়ে আয়ারের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছবিটির চরিত্র ও অ্যাকশন নির্মাণে প্রভাব ফেলেছে।
তবে ছবির লড়াই শুধু প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়। জেমসকে নিজের অতীতের সঙ্গেও লড়তে হয়। যুদ্ধের স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা এবং নতুন করে কারও ওপর বিশ্বাস রাখার বিষয়গুলোও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই জায়গাতেই ওডিনের উপস্থিতি বিশেষ অর্থ বহন করে। জেমসের জন্য সে শুধু বেঁচে থাকার সহযোগী নয়, বরং এমন এক সঙ্গী, যার সঙ্গে ভাষা ছাড়াই তৈরি হয়েছে গভীর সম্পর্ক। মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সিনেমাটি সেই বিষয়টিকেও সামনে আনে।
ওডিন চরিত্রে অভিনয় করেছে জার্মান শেফার্ড ‘উবার’। ব্র্যাড পিটের সঙ্গে শুটিংয়ের সময় উবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। পিট জানিয়েছেন, সিনেমার অনেক দৃশ্যে উবারের স্বাভাবিক আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সে যেদিকে যেতে চাইত, অনেক সময় দৃশ্যও সেদিকেই এগিয়ে নেওয়া হতো।
পিট মজা করে উবারকে সিনেমার ‘আসল তারকা’ এবং কল শিটের ‘নাম্বার ওয়ান’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জেমস ও ওডিন কীভাবে একে অপরের ওপর নির্ভর করে এবং একসঙ্গে পথ পাড়ি দেয়, সেটিই গল্পের অন্যতম সুন্দর দিক।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পিট সিনেমাটিকে এক অর্থে প্রেমের গল্প হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছে ছবিটির বিষয় শুধু দুর্গম পরিবেশে টিকে থাকা নয়; বরং মানুষ অন্য কোনো মানুষ কিংবা প্রাণীর জন্য কতটা করতে পারে, সেই গভীর সম্পর্কও গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে।
এদিকে ব্র্যাড পিটের সামনে রয়েছে আরও একটি আলোচিত সিনেমা—‘দ্য ফারদার মিস-অ্যাডভেঞ্চার্স অব ক্লিফ বুথ’। কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর চিত্রনাট্যে ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত এই ছবিতে ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন হলিউড’-এর অস্কারজয়ী চরিত্র ক্লিফ বুথ হিসেবে ফিরছেন পিট। ১৯৭৭ সালের পটভূমিতে নির্মিত সিনেমাটিতে বদলে যাওয়া হলিউডের অন্ধকার জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ক্লিফ। ছবিটি আগামী ২৫ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে মুক্তির কথা রয়েছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি