
ঢাকা শহরের শহীদ মিনার চত্বরে সম্প্রতি একজন স্বঘোষিত ট্রান্সজেন্ডার সমকামী পুরুষ অন্য এক সমকামী পুরুষের সঙ্গে “বিয়ের অধিকার” দাবিতে অনশন শুরু করেছে। এই ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত বিভ্রান্তির বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো সরকার, আলেম সমাজ, সুশীল সমাজ, এমনকি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কেউই যেন এই অনৈতিকতার প্রতি ন্যূনতম প্রতিক্রিয়াও দেখাতে প্রস্তুত নয়।
আমাদের এই নীরবতা কি তবে একপ্রকার অপরাধে সম্মতি নয়?
১. শরিয়ার দৃষ্টিতে: সমকামী ফিতনার পুনর্জাগরণ
ইসলাম এই ধরনের সম্পর্ককে স্পষ্টভাবে হারাম ও ফাহিশা (অশ্লীলতা) হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছো, যা তোমাদের পূর্বে কোনো জাতি করেনি?” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৮০)!
লুত (আ.)-এর জাতি যখন পুরুষে পুরুষে যৌনাচার করত এবং একে বৈধতা দিতে চেয়েছিল, তখন আল্লাহ তাদের শহর উল্টে দিলেন এবং প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। “অতঃপর আমরা তাদের নগরী উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম।” (সূরা হূদ ১১:৮২)!
অতএব, শরিয়ার দৃষ্টিতে পুরুষে পুরুষে বিবাহের দাবি হলো আল্লাহর সৃষ্ট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং এই বিদ্রোহের পরিণতি সর্বদাই ধ্বংস।
২. মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়:
বিবাহ হলো মানবতার এক প্রাকৃতিক প্রতিষ্ঠান, যা প্রজনন, পরিবার, দায়িত্ব, ভালোবাসা ও স্থায়িত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। পুরুষে পুরুষে বা নারী নারী সম্পর্ক প্রকৃতির এই ভারসাম্য ভেঙে দেয়।
এ ধরনের সম্পর্ক ভালোবাসা নয়, এটি খেয়াল, খুশি, হাওয়া-বাসনা ও আত্ম বিভ্রমের এক রোগ, যা সমাজে বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা ও মানসিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে।
৩. দর্শন ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে: নীরবতা মানেই অনুমোদন
একটি সভ্য সমাজ তখনই বিপর্যস্ত হয়, যখন অধিকার ও ইচ্ছাকে সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড বানানো হয়। আজ যদি আমরা বলি, “তাদেরও তো ভালোবাসার অধিকার আছে”, তাহলে কাল কেউ বলবে, “আমাদেরও অনৈতিকতা করার অধিকার আছে।” এভাবে সমাজ ধীরে ধীরে অধিকারবাদী অনৈতিকতার নৈরাজ্যে দেশ নিমজ্জিত হবে।
আর যদি আমরা নীরব থাকি, তবে সেই নীরবতা হবে পাপাচারের পক্ষে এক প্রকার মৌন সম্মতি। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় দেখে, তা যেন সে হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে; যদি তা না করতে পারে, তবে যেন জবান দিয়ে প্রতিরোধ করে; আর যদি তাও না পারে, অন্তত অন্তর দিয়ে যেন ঘৃণা করে; আর সেটিই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহিহ মুসলিম)
৪. রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব:
বাংলাদেশের সংবিধান ইসলামী মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই রাষ্ট্রে “পুরুষে পুরুষে বিবাহের অধিকার” দাবি করা মানে শুধু ধর্ম নয়, সংবিধান ও জাতীয় সংস্কৃতির প্রতিও অবমাননা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব, বিভ্রান্তদের সংশোধন করা, বিভ্রান্তিকে বৈধতা দেওয়া নয়। আলেম সমাজের দায়িত্ব, সত্যের পক্ষে আওয়াজ তোলা, ভয় পেয়ে চুপ করে বসে থাকা নয়। সুশীল সমাজের দায়িত্ব, নৈতিকতা রক্ষা করা, বিকৃতিকে সহানুভূতির ছদ্মবেশে লালন করা নয়।
৫. কুরআনের সতর্কবাণী: পাপের প্রসার নীরবতায় হয়
“যারা চায় অশ্লীলতা মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি।” (সূরা আন-নূর ২৪:১৯)!
অশ্লীলতা শুধু পাপীর কারণে ছড়ায় না, বরং ছড়ায় তখনই, যখন নীতিবানরা নীরব থাকে।
৬. উপসংহার: এখনই নীরবতা ভাঙার সময়
আজকের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বিপজ্জনক সাংস্কৃতিক স্রোতের ইঙ্গিত। যদি আমরা আজই না বলি, “না, এটি আমাদের সমাজে চলবে না”, তবে আগামী প্রজন্ম এমন এক বাংলাদেশে বেড়ে উঠবে যেখানে পাপ হবে অধিকার, আর সত্য হবে অপরাধ।
পাপ যখন সাহসী হয়, সত্য যখন নীরব থাকে, তখনই ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়। সুতরাং আমাদের এখনই সময়, আলেমদের জেগে উঠার, রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার এবং সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের আওয়াজ তোলার।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে