
ড. এ. টি. এম. সাদিকুর রহমান
যুদ্ধ থামলে আকাশে ধুলো থিতিয়ে পড়ে, ধ্বংসস্তূপের নিচে নিস্তব্ধতা নামে। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরও এক প্রশ্ন গুঞ্জরিত হয়—এই সংঘাতের শেষ কোথায়? ইসরায়েল ও গাজার মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি বিশ্ববাসীর মনে একটুখানি স্বস্তি এনে দিয়েছে, কিন্তু এই শান্তি কি টেকসই? ইতিহাস বলছে, এই প্রশ্নের উত্তর এখনো ধোঁয়াশার ভেতরই রয়ে গেছে।
যুদ্ধবিরতির বাস্তবতা
ইসরায়েল-গাজা সংঘাত আধুনিক বিশ্বের দীর্ঘতম ও জটিলতম সংঘাতগুলোর একটি। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফিলিস্তিনি জনগণের বাস্তুচ্যুতি, অধিকৃত ভূমি, এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নে গভীর ক্ষোভ জমে আছে। প্রতিবারই যখন সহিংসতা বাড়ে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়—কখনও মিশর, কখনও কাতার, কখনও জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করে। কিন্তু এই বিরতিগুলো অধিকাংশ সময়ই “অস্থায়ী চিকিৎসা”—রোগ সারায় না, কেবল ক্ষত ঢেকে রাখে।
মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র
গাজার বাস্তবতা আজ এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের নাম। ঘনবসতিপূর্ণ এই উপকূলীয় অঞ্চলে লাখো মানুষ বাস করে; সেখানে বিদ্যুৎ, পানি ও চিকিৎসা প্রায় অপ্রতুল। হাসপাতালগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত, শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে, এবং অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন। যুদ্ধবিরতির পরও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়নি—কারণ পুনর্গঠনের সুযোগ ও অর্থ উভয়ই সীমিত।
অন্যদিকে, ইসরায়েলেও সাধারণ নাগরিকেরা ভয়ের মধ্যে বেঁচে আছেন। রকেট হামলার আতঙ্ক, আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার জীবনযাপন, ও নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের মনোজগতে গভীর দাগ ফেলেছে। ফলে দুই দিকেই ভয় ও ঘৃণার এক দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে—যা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য সুবিধাজনক হলেও শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
শান্তির রাজনীতি ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের শান্তি প্রচেষ্টার ইতিহাস দীর্ঘ হলেও সফলতা খুবই সীমিত। অসলো চুক্তি (১৯৯৩) এক সময় আশার আলো দেখিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে সেই চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিভাজন, গাজায় হামাসের উত্থান, পশ্চিম তীরের বিভক্ত প্রশাসন—সবকিছু মিলিয়ে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বও এখন ঐক্যহীন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও প্রায়শই দ্বিধাগ্রস্ত। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থে অটল, আরব দেশগুলো আবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে একক অবস্থান নিতে পারে না। জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখে কার্যকর হয় না।
অবিশ্বাসের প্রাচীর
এই সংঘাতের গভীরতম শিকড় অবিশ্বাস। ইসরায়েল মনে করে, গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শান্তি চায় না; ফিলিস্তিনিরা মনে করে, ইসরায়েল কখনও তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র মেনে নেবে না। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস এতটাই গভীর যে, প্রতিটি ছোট ঘটনা থেকেও বড় সংঘাত তৈরি হয়।
যখন একটি প্রজন্ম বোমার শব্দে বড় হয়, তখন তাদের মানসিক মানচিত্রে "শত্রু" নামের একটি স্থায়ী ধারণা তৈরি হয়। গাজায় যেমন প্রতিটি ইসরায়েলি ফাইটার জেট ভয় ও ঘৃণার প্রতীক, তেমনি ইসরায়েলে প্রতিটি রকেটের শব্দ ফিলিস্তিনিদের প্রতি আতঙ্ক ও প্রতিশোধবোধ জাগায়। এই মানসিক দেয়াল ভাঙা সবচেয়ে কঠিন কাজ।
নতুন প্রজন্ম ও সম্ভাবনার আলো
তবু পুরো চিত্রটা অন্ধকার নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের নাগরিক সমাজে ক্ষুদ্র কিন্তু সাহসী কিছু শান্তি উদ্যোগ দেখা গেছে। যৌথ সাংস্কৃতিক প্রকল্প, মানবাধিকার সংগঠন, এবং তরুণদের শান্তি আন্দোলন—সবই প্রমাণ করে, যুদ্ধের ক্লান্তি মানুষকে বিকল্প ভাবনায় ঠেলে দিচ্ছে।
এছাড়া প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এক নতুন ভূমিকা রাখছে। এখন এক গাজার তরুণের কণ্ঠ তেল আভিভের তরুণও শুনতে পাচ্ছে; এক ইসরায়েলি সাংবাদিক গাজার মায়ের কান্না সরাসরি দেখতে পাচ্ছে। এই মানবিক সংযোগই ভবিষ্যতের শান্তির বীজ হতে পারে।
সমাধানের পথ কোথায়?
স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন তিনটি স্তম্ভ—ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও সহাবস্থান।
ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচার মানে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জীবনযাপনের স্বাধীনতা।
ইসরায়েলের জন্য নিরাপত্তা মানে সীমান্তের সুরক্ষা ও অস্ত্রবিরতির নিশ্চয়তা।
আর সহাবস্থান মানে, উভয় পক্ষের মানুষ যেন একে অপরের মানবিক মর্যাদা স্বীকার করে নিতে পারে।
এই লক্ষ্য অর্জনে কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, আঞ্চলিক শক্তিগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। মিশর, জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়ন—সবাইকে একযোগে এমন এক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা ফিলিস্তিনি পুনর্গঠন ও ইসরায়েলি নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেয়।
উপসংহার: মানবতার পুনর্জাগরণই একমাত্র উত্তর
ইসরায়েল ও গাজার এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় কেবল রাজনীতি নয়, এটি মানবতারও পরীক্ষা। শিশুরা যখন মৃত্যুর ভয় নিয়ে জন্মায়, তখন কোনো জাতিই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ নয়। যুদ্ধবিরতি এক মুহূর্তের নিঃশ্বাস এনে দেয়, কিন্তু যদি সেই সময়টিকে শান্তির বীজ বোনার জন্য ব্যবহার না করা যায়, তবে ইতিহাস আবারও একই চক্রে ঘুরবে।
শান্তি কেবল চুক্তির ফল নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের ফল। উভয় পক্ষ যদি তাদের অতীতের ক্ষত ভুলে না যায়, তবে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতেও পারবে না। সেই কারণেই আজ প্রয়োজন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির—যেখানে বিজয় নয়, বরং সহাবস্থানই চূড়ান্ত লক্ষ্য।
গাজার শিশু আর তেল আভিভের শিশু, তাদের আকাশ এক, তাদের ভয়ও এক। এই সাধারণ মানবিক সত্যই হয়তো একদিন ইসরায়েল ও গাজার সীমান্ত অতিক্রম করে শান্তির নতুন সূচনা লিখবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
(লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)