
যশোরসহ দেশের শহর ও গ্রামীণ এলাকায় দিন দিন ব্যাটারিচালিত রিকশার দখল বাড়ছে। স্বল্প খরচ, দ্রুত গতি ও সহজলভ্যতার কারণে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও, অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এখন নগর জীবনের জন্য এক ভয়াবহ সংকটে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন গতি, নিম্নমানের ব্রেকিং সিস্টেম এবং অদক্ষ চালকের কারণে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানি ও পঙ্গুত্ব। যশোরের মানুষের কাছে এই রিকশা এখন প্রকৃত অর্থেই এক “গলার কাঁটা”।
ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে অনুমোদনের তুলনায় বহু গুণ বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। অতিরিক্ত সংখ্যা ও বেপরোয়া গতি যানজট বাড়াচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে ট্রাফিক ব্যবস্থা। এসব যান শুধু দুর্ঘটনার কারণ নয়, ছিনতাই ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
পরিবেশ ও বিদ্যুৎ খাতেও এর প্রভাব মারাত্মক। এসব রিকশায় ব্যবহৃত নিম্নমানের লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতিটি রিকশায় ৪ থেকে ৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ হয়। অবৈধ সংযোগ থেকে চার্জ নেওয়ার কারণে লোডশেডিং বাড়ছে এবং বৈধ গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরির যন্ত্রাংশ আমদানি ও উৎপাদন বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি সঠিকভাবে রিসাইকেল না করায় ভয়াবহ সীসা দূষণ ঘটছে, যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের স্নায়ুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ARI)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার। এদের নকশা দুর্বল, নিরাপত্তা মানদণ্ডহীন—ফলে সামান্য ধাক্কাতেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে।
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের প্রায় ২০ শতাংশই ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনার শিকার। ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান জানান, অধিকাংশ চালকই অপ্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সবিহীন। সাধারণ রিকশার গতি যেখানে ঘণ্টায় ১০-১৫ কিলোমিটার, সেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশার গতি ৩০-৩৫ কিলোমিটার। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
এখনও সরকারিভাবে এই যান অনুমোদিত নয়, তবু লাখো বেকার মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে এটির ওপর। নিষিদ্ধের উদ্যোগ নিলেই বিক্ষোভের মুখে তা প্রত্যাহার করতে হয়। ফলে এটি এখন এক অনিয়ন্ত্রিত বাস্তবতা।
চৌরাস্তা এলাকার গৃহিণী ফারিয়া আক্তার বলেন, “বাচ্চাকে স্কুলে নিতে গিয়ে বহুবার পড়ে গিয়ে আহত হয়েছি। চালকদের বললেও তারা ধীরে চালায় না।” ব্যাংকার হামিদুল ইসলাম বলেন, “এগুলো শহরের ভাইরাসে পরিণত হয়েছে। রাস্তার শৃঙ্খলা নষ্ট করছে। সরকারের এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ করে নিষিদ্ধ না করে ধাপে ধাপে বিকল্প কর্মসংস্থান, নিরাপদ নকশা ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। পাশাপাশি ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও চার্জিং স্টেশন স্থাপন করে বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা সম্ভব।
তাদের মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশা হয়তো যাত্রীদের কাছে দ্রুত ও সাশ্রয়ী বাহন, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত গতি, নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশ দূষণের কারণে এটি এখন এক “মরণফাঁদে” পরিণত হয়েছে। তাই নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণই হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ