বাংলাদেশের উত্তর প্রান্তের শেষ উপজেলা তেঁতুলিয়া, একসময় শুধুই সীমান্তঘেরা জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন তার পরিচয় বদলে গেছে। এ অঞ্চল গড়ে উঠছে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে। পাহাড়, নদী, চা-বাগান, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সীমান্ত বন্দর, সব মিলিয়ে তেঁতুলিয়া এখন পর্যটনের নতুন আকর্ষণ।
দর্শনীয় স্থানসমূহ
কাঞ্চনজঙ্ঘা
দক্ষিণের টেকনাফ থেকে উত্তরের তেঁতুলিয়া ভ্রমণ করলে যেন বাংলাদেশের অর্ধেক সৌন্দর্যই দেখা হয়ে যায়। শরৎ, হেমন্ত ও শীতকালে এই জনপদ রূপ নেয় উৎসবমুখর শহরে। দেশের ভেতর থেকেই দেখা যায় হিমালয়ের সুউচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা রোদের আভায় সোনালি রঙে ঝলমল করা এ দৃশ্যই পর্যটকদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
তেঁতুলিয়ার চারপাশ ঘেরা মহানন্দা নদী, সবুজ চা-বাগান, পৃথু রাজার দিঘি, শাহী মসজিদ, গোলকধাম মন্দির, বার আউলিয়া মাজারসহ নানা প্রাচীন স্থাপনা পর্যটকদের টানে। ইংরেজ আমলের জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ও ঐতিহাসিক তেতুলতলা এখনো সেই অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মহানন্দা পার্ক ও ওয়াকওয়ে
পুরোনো বাজারের জায়গায় গড়ে উঠছে আধুনিক মহানন্দা পার্ক। নদীর তীরে নির্মিত হচ্ছে ওয়াকওয়ে, যেখান থেকে হেঁটে হেঁটে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য। পার্কে যুক্ত হচ্ছে চিলড্রেন রাইডস, খেলার মাঠ, পিকনিক কর্নার, ভলিবল ও টেনিস কোর্ট, যা পারিবারিক বিনোদনের নতুন কেন্দ্র তৈরি করবে।
বাংলাবান্ধা
বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের সংযোগস্থল বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর এখন বাণিজ্য ও পর্যটনের মিলনস্থল। এখানেই নির্মিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে উঁচু ১৪০ ফুট পতাকা স্তম্ভ, যেখানে প্রযুক্তির সহায়তায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পতাকা ওড়ে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে গেইট, আলোকসজ্জা ও স্ট্রিট লাইট। প্রশাসনের আশা এসব উদ্যোগ পর্যটনে যোগ করবে নতুন মাত্রা।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
গত এক দশকে তেঁতুলিয়ার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ইউএনও সানিউল ফেরদৌস, সোহাগ চন্দ্র সাহা ও উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শাহীন তাঁদের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ডাকবাংলো পিকনিক কর্নারে ভাস্কর্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেন্দ্র, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কমপ্লেক্স, ইকোপার্ক, ওয়াচ টাওয়ার ও ফোয়ারা নির্মাণে বদলে গেছে তেঁতুলিয়ার চেহারা।
বর্তমান ইউএনও আফরোজ খসরু বলেন, তেঁতুলিয়া পর্যটনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি এলাকা। মহানন্দা পার্ক, পতাকা স্ট্যান্ড, ওয়াকওয়ে ও আলোকসজ্জার কাজ চলছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আবাসন নিশ্চিত করতে একটি অনলাইন হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন তৈরি হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য তেঁতুলিয়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা।
ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন পঞ্চগড়-এর সভাপতি সরকার হায়দার বলেন, সাবেক ইউএনও সানিউল ফেরদৌসের হাত ধরে তেঁতুলিয়ার পর্যটনের সূচনা হয়। বর্তমান ইউএনও আফরোজ খসরু সেই ধারাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছেন। আমরা সরকারের কাছে পঞ্চগড়কে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানাই।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমান ইউএনও শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, একজন দূরদর্শী পরিকল্পনাবিদ। তাঁর নেয়া কর্মপরিকল্পনা ইতোমধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শেষ কথা
তেঁতুলিয়ার সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব ঘিরে গড়ে উঠছে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটন সেবা প্রতিষ্ঠান। এতে স্থানীয় মানুষের জীবিকার সুযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি বিকাশ ঘটছে ইকো-ট্যুরিজমের। সব মিলিয়ে সীমান্তঘেরা জনপদ তেঁতুলিয়া এখন উত্তরবঙ্গের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র, যা ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক অনন্য গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/শাহো