বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেয়া হবে না       নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মোংলায় বিএনপির বিক্ষোভ       আওয়ামী লী‌গের তিন নেতা গ্রেপ্তার      সাতক্ষীরায় জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রকল্পের সমাপনী      সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ       আইনশৃঙ্খলা সভায় হট্টগোল, তর্কে জড়ালেন এমপি হান্নান      লাতিন আমেরিকার দুই দলকে হারাল জাপান-কোরিয়া      কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ৫১ কিশোর আটক      প্রথম ১৪ ওয়ানডেতেই ইতিহাস গড়লেন ম্যাথু ব্রিটজকে      ২৫ সেপ্টেম্বরের মুর্তজা কিজিলবাশের কনসার্ট স্থগিত      অঙ্কন-নন্দিতার দ্বৈত কণ্ঠে আজ প্রকাশিত হচ্ছে ‘মথুরা’      ফোটন সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন      
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ: কুরআনের কালজয়ী শিক্ষার আধুনিক প্রতিচ্ছবি
মো. খায়রুল হাসান সিএসএএ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১০:২২ পিএম আপডেট: ৩০.০৯.২০২৫ ১০:২৫ PM
মো. খায়রুল হাসান সিএসএএ

মো. খায়রুল হাসান সিএসএএ

বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নানাবিধ অনিয়ম, লাগামহীন দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে এক সংকটজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছিল। এস. আলম এবং নাসা গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে এসব অর্থের বড় অংশই বিদেশে পাচার করেছে এবং পরবর্তীতে এই ঋণকে খেলাপি ঋণে পরিণত করে ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের চরম অবনতিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল, বহু ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে ভুগছিল এবং গ্রাহকদের আস্থার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এই ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার ফলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় একটি ‘সিস্টেমিক রিস্ক’ বা পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পথে ছিল। 

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গত ৯ মে, ২০২৫ তারিখে জারিকৃত "ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫" দেশের আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, কতিপয় ব্যাংকের চরম দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক সুশাসনের ঘাটতির মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে এই অধ্যাদেশকে একটি অপরিহার্য ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এই রেজল্যুশন একজন সচেতন ব্যাংকার হিসেবে জানার প্রয়োজনীয়তা মনে করে পড়ার সময় কিছু প্রশ্ন আমাকে গভীরভাবে ভাবনার খোরাক জোগায়। আধুনিক এই আর্থিক ব্যবস্থাপনা- ব্যাংক রেজল্যুশনের ঐতিহাসিক ভিত্তি কী এবং ইসলামের ইতিহাসে এর কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় কি না।

উত্তর খুঁজতে আমি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতন, ধ্বংস বা পুনর্গঠনের ঘটনাগুলো নতুনভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করি। পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে বিশেষ করে সূরা নূহ , সূরা হূদ, সূরা আল-আ'রাফ, সূরা আল-আহক্বাফ, সূরা আল-হিজর এবং সূরা আশ-শু'আরা তে বর্ণিত হয়েছে যখনই কোনো জাতি তাদের নবীকে অস্বীকার করেছে, আল্লাহর বিধানকে উপহাস করেছে এবং সীমালঙ্ঘনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখনই তাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি নেমে এসেছে। তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এই ধ্বংসের পর বিশ্বাসীদের হাত ধরে পৃথিবীতে পুনরায় সত্য এবং ন্যায়ের যাত্রা শুরু হয়েছে, যা মানব সভ্যতাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে এনেছে। 

এই ঘটনাগুলো যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক সীমালঙ্ঘন, অবিচার এবং অব্যবস্থাপনার পরিণতিতেই যেকোনো সভ্যতা, জাতি বা জনপদ কিংবা ব্যবস্থার পতন ঘটে এবং এই সমস্ত পতন থেকে বৃহত্তর সমাজকে রক্ষা করার জন্য সময়োচিত হস্তক্ষেপ, ন্যায়বিচার ও পুনর্গঠন অপরিহার্য। 

অন্যদিকে, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশটি বস্তুত কুরআনে বর্ণিত নীতিসমূহেরই একটি আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, যা বছরের পর বছর ধরে চলা পদ্ধতিগত অবক্ষয়, সুশাসনের চরম ঘাটতির জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার পতন রোধ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণের পথনির্দেশ করে। 

মানব সভ্যতার এই উত্থান-পতন, ধ্বংস বা পুনর্গঠনের বা মার্জারের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ব্যাংক মার্জারের যৌক্তিকতা বা সাদৃশ্যতার কিছু আলোচনা করা যেতে পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক পতন এবং কুরআনের সতর্কবার্তা: সীমালঙ্ঘনের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
পবিত্র কুরআন যেকোনো ব্যবস্থার পতনের মূল কারণ হিসেবে ‘ফাসাদ ফিল-আরদ’ (পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি) এবং সীমালঙ্ঘনকে চিহ্নিত করেছে। এই বিপর্যয় কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং এটি একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দেয়।
কওমে শু'আইব ও অর্থনৈতিক আস্থার সংকট: কওমে শু'আইব বা মাদইয়ানবাসীর মূল অপরাধ ছিল অর্থনৈতিক প্রতারণা, বিশেষ করে মাপে কম দেওয়া, যা তাদের ব্যবসায়িক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে এটি ছোট অপরাধ মনে হলেও, এর গভীরে ছিল পুরো বাজার ব্যবস্থার প্রতি গণ-অনাস্থা তৈরির এক নীলনকশা। একটি অর্থনীতি দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর; বিশ্বাসই হলো তার অদৃশ্য মুদ্রা। যখন উৎপাদক, ভোক্তা এবং আমানতকারীর এই বিশ্বাসে ফাটল ধরে, তখন বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। ঠিক যেমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, যখন তার পরিচালকরা আমানতকারীদের বিশ্বাস ভঙ্গ করেন, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির আশ্রয় নেন। এটি আধুনিক আর্থিক জগতে ‘আমানতের খেয়ানত’ (Breach of Fiduciary Duty)-এর এক ঐতিহাসিক উদাহরণ, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য করে দেয়।

‘আদ, সামূদ ও ‘Too Big to Fail’ মানসিকতা: 
‘আদ ও সামূদ জাতি নিজেদের শারীরিক শক্তি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং সুরক্ষিত অট্টালিকার জন্য অহংকারী ছিল। তারা নিজেদের ‘অজেয়’ মনে করত। এই মানসিকতা আজকের কর্পোরেট জগতের ‘too big to fail’  ধারণার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। যখন কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান মনে করে যে তার পতন হতে পারে না, তখন সে বেপরোয়া ঝুঁকি গ্রহণে উৎসাহিত হয়। এই অহংকার ও আত্মতুষ্টি তাদের বিবেককে ধ্বংস করে দেয়, যা কেবল নিজেদের নয়, বরং পুরো ব্যবস্থাকেই সংকটের মুখে ফেলে দেয়। এই জাতির প্রযুক্তিগত দক্ষতা (যেমন পাহাড় খোদাই করে বাড়ি বানানো) তাদের নৈতিক ও পদ্ধতিগত পতন থেকে রক্ষা করতে পারেনি, যা প্রমাণ করে যে বাহ্যিক শক্তি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নৈতিকতাই স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি।

ফেরাউন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বৈরাচার: 
ফেরাউন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক শোষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল। সে নিজেকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে মনে করত এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছিল। এটি এক ধরনের ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-এর নিকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে একটি ক্ষুদ্র ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে শোষণ করে। যখন কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে ভেবে আমানতকারীদের অর্থকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে খেলাপি ঋণের পাহাড় গড়ে তোলে, তখন ফেরাউনের মতোই সেই প্রতিষ্ঠানের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

"ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫"-এর ধারা ১৫ অনুযায়ী, যখন কোনো ব্যাংক মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট বা চরম খেলাপি ঋণের কারণে "অকার্যকর" (Non-Viable) হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করার যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে এই কুরআনের শিক্ষারই একটি আধুনিক প্রয়োগ। এর উদ্দেশ্য হলো, বিপর্যয়কে আর বিস্তৃত হতে না দিয়ে একটি চূড়ান্ত সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে রক্ষা করা।

কুরআন মডেলে সংকট ব্যবস্থাপনা: অপরিহার্য অংশকে বাঁচিয়ে তোলা
কুরআন শিক্ষা দেয় যে, চূড়ান্ত ধ্বংসের পূর্বেও আল্লাহ সংশোধনের সুযোগ দেন এবং বিপর্যয়কালে নিরপরাধ ও অপরিহার্য অংশকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করেন।

হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকা ও ‘ব্রিজ ব্যাংক’: 
মহাপ্লাবনের ঘটনা একটি নিখুঁত রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত। এখানে নৌকাটি ছিল একটি নির্বাচিত "উদ্ধারকারী ব্যবস্থা" (Rescue Vehicle), যা আজকের ‘ব্রিজ ব্যাংক’-এর আদিরূপ। এই নৌকায় "ভালো সম্পদ" (মুমিন ও প্রত্যেক জীবের জোড়া) এবং "খারাপ সম্পদ" (অবিশ্বাসী ও সীমালঙ্ঘনকারী) স্পষ্টভাবে পৃথক করা হয়েছিল। উদ্ধারের উদ্দেশ্য কেবল জীবনরক্ষা ছিল না, বরং একটি নতুন ও সুস্থ সমাজের "স্বাস্থ্যকর জিনগত উপাদান" (Healthy DNA) রক্ষা করাও ছিল। এই মডেল অনুসরণ করেই রেজল্যুশন অধ্যাদেশের ধারা ৩০ থেকে ৩২-এ ‘ব্রিজ ব্যাংক’-এর ধারণা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যর্থ ব্যাংকের কার্যকর সম্পদ ও গ্রাহক পরিষেবা (ভালো সম্পদ) একটি নতুন কাঠামোতে স্থানান্তর করে সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা হয় এবং খেলাপি ঋণের মতো "খারাপ সম্পদ" (Toxic Assets) বিলুপ্তির জন্য মূল সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের কাঠামোতে রেখে দেওয়া হয়। ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রম একদিনের জন্যও ব্যাহত হয় না এবং সমাজে আতঙ্ক ছড়ায় না।

হযরত ইউসুফ (আ.)-এর প্রাক-সংকট ব্যবস্থাপনা: 
দুর্ভিক্ষের পূর্বে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর গৃহীত খাদ্যশস্য মজুদ ও সুষম বণ্টনের পরিকল্পনা একটি প্রাক-সংকট (Pre-emptive) ব্যবস্থাপনার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি সমৃদ্ধির বছরগুলোতে উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয় করে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এটি আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দূরদর্শী নীতি প্রণয়নের সঙ্গে তুলনীয়, যার মূল লক্ষ্য হলো সংকট আসার পূর্বেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (যেমন: Capital Adequacy Ratio, Stress Testing) গ্রহণের মাধ্যমে বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। হযরত ইউসুফের পরিকল্পনা ছিল ইতিহাসের সফলতম ‘স্ট্রেস টেস্ট’, যা শিখিয়েছে যে সমৃদ্ধির সময়েই মন্দার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়।

জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার: ‘বেল-ইন’ ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি
কুরআনের অন্যতম মূল শিক্ষা হলো, ব্যবস্থার পতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে, যা একটি সুস্থ সমাজ ও টেকসই অর্থনীতির পূর্বশর্ত। ক্ষমতার অপব্যবহারকে বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেওয়া হলে তা নতুন অপরাধকে উৎসাহিত করে।

ফেরাউনের পরিণতি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: 
আল্লাহ ফেরাউনের মৃতদেহকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হিসেবে রক্ষা করার ঘোষণা দেন, যাতে মানুষ ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করে। এটি এক ধরনের ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ (Deterrence), যা অন্যদের একই অপরাধ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে। এটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবীতে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং চূড়ান্ত জবাবদিহিতা থেকে বাঁচার কোনো পথ নেই।

এই ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করেই অধ্যাদেশের ধারা ৭৭ থেকে ৮২ পর্যন্ত দায়ী পরিচালকদের চিহ্নিত করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। এর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিফলন ঘটেছে ধারা ৩৩-এর ‘বেল-ইন (Bail-in)’ ব্যবস্থায়। এই নীতি অনুযায়ী, ব্যাংকের ব্যর্থতার দায় প্রাথমিকভাবে তার মালিক (শেয়ারহোল্ডার) ও পরিচালকদের ওপর বর্তায়। এটি প্রচলিত ‘বেল-আউট’ (Bail-out) ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে জনগণের করের অর্থে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো হয়, যা সাধারণ মানুষের প্রতি এক চরম অবিচার। ‘বেল-ইন’ ব্যবস্থাটি ইসলামী ফিকহের সুপ্রসিদ্ধ নীতি "আল-গুনমু বিল-গুরম" (লাভের সঙ্গে ঝুঁকির দায়ও জড়িত)-এর একটি বাস্তব প্রয়োগ। এর অর্থ হলো, যারা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ভোগ করেছেন, তাদেরকেই লোকসানের দায় প্রথমে নিতে হবে। এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

পরিশেষে বলতে পারি "ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫" আধুনিক আইন আইন হলেও এটি মূলত সেই শাশ্বত কুরআনের নীতিমালারই একটি প্রায়োগিক প্রতিফলন। সীমালঙ্ঘনের পরিণতি রোধ করা, সংকটকালে অপরিহার্য অংশকে রক্ষা করা, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি করা এবং একটি নতুন ও টেকসই সূচনা নিশ্চিত করা—এই প্রতিটি নীতি কুরআনের কালজয়ী শিক্ষায় গভীরভাবে প্রোথিত। সুতরাং, এই অধ্যাদেশ কেবল একটি আর্থিক সুরক্ষার আইন নয়, বরং এটি একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে অপরিহার্য এক পদক্ষেপ, যার ভিত্তি নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য আইনের পাশাপাশি নৈতিকতারও প্রয়োজন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: ইসলামি ব্যাংকার এবং বাহরাইনভিত্তিক আওফি’র একজন সার্টিফায়েড শরিয়াহ অ্যাডভাইজর অ্যান্ড অডিটর।


স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর


আরও সংবাদ   বিষয়:  ব্যাংক রেজল্যুশন   অধ্যাদেশ   কুরআন   কালজয়ী   






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close