
আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাজার দখল করে নিয়েছে নানারকম ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ও বিভিন্ন ডিভাইস-অ্যাপস। এর ফলে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ডুগি, তবলা ও হারমোনিয়ামের মতো ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু রূপ বদলেছে। প্রাচীনকালে সেগুলো ব্যবহৃত হতো ধর্মীয় ও প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানে। পরবর্তীতে সংস্কৃতির বিকাশের সাথে বাদ্যযন্ত্র বিনোদনেরও অংশ হয়ে ওঠে।
এক সময় যাত্রাপালা থেকে শুরু করে পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানে হারমোনিয়াম, ডুগি-তবলা ব্যবহারের প্রচলন ছিল। কিন্তু এখন হারিয়ে যাচ্ছে ডুগির শব্দ আর হারমোনিয়ামের সুর। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বিক্রি হ্রাস পাওয়া এবং সরকারিভাবে কোনো সহজ শর্তে ঋণ বা সুযোগ-সুবিধা না থাকায় প্রাচীন এই শিল্প টিকে থাকতে পারছে না।
অনেকে জীবিকার তাগিদে বদলে নিয়েছেন পেশা। একসময় যেখানে এই শিল্পে ছিলো যৌলুস, সেখানে এখন গুটিকয়েক মানুষ নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও কোনোরকমে টিকিয়ে রেখেছেন বাপ-দাদার পেশা। অথচ লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এটি।
পাবনা পৌর সদরের কয়েকজন বাদ্যযন্ত্র কারিগর জানান, কষ্ট হলেও বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন। না হলে অনেক আগেই অন্য পেশায় চলে যেতেন।
বাদ্যযন্ত্র কারিগর সুরজিত রবি দাসের নাতি ও “সুর তরঙ্গ”-এর স্বত্বাধিকারী রামকৃষ্ণ মনিদাস বলেন, “১৯৭৩ সালে দাদু সুরেন্দ্র মনিদাস এই কাজ শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর বাবা হাল ধরেন। এখন কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও ডিজিটাল যন্ত্রের কারণে তেমন অর্ডার আসে না, তৈরি জিনিসও বিক্রি হয় না। আয়-রোজগার টিকছে না, সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে আবারও এই পেশায় প্রাণ ফিরবে।”
শালগাড়িয়ার বাসিন্দা পরিতোষ চন্দ্র জানান, “৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। কিন্তু এখন মোবাইল ফোন আর ইলেকট্রনিক যন্ত্রে বাজার দখল হয়ে গেছে। আমাদের ব্যবসা নেই বললেই চলে। তবে সংস্কৃতিকে বাঁচাতে সরকার উদ্যোগ নিলে আগের রূপ ফিরবে।”
হারমোনিয়াম তৈরিতে দীর্ঘদিন যুক্ত সুরনিকেতনের স্বত্বাধিকারী সঞ্জয় কুমার সিংহ বলেন, “৪১ বছরের বেশি সময় ধরে হারমোনিয়াম তৈরি করছি। কিন্তু এখন আর সেই ব্যবসার প্রাণ নেই। আধুনিকতার কারণে মানুষ সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, ধারাও পাল্টে গেছে। আমার পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো এই পেশা ধরে রাখতে পারবে না। তবে নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিতে আগ্রহী করলে হয়তো আবারও আগের গৌরবে ফিরবে।”
পাবনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম বলেন, “সংস্কৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিকাশে সংস্কৃতির অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বায়নের যুগেও পুরোনো বাদ্যযন্ত্র আমাদের প্রাণ জাগায়। তাই নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিতে আগ্রহী করতে হবে এবং যারা এই পেশায় আছেন তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা দিতে হবে। তবেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।”
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ