
আইনের ফাঁকফোকড়ে বেরিয়ে আসছে মাদক কারবারিরা
মাদকের চাদরে মুড়ে আছে গোটা টাঙ্গাইল। প্রতিনিয়ত নদী পথে, রেল পথ আর সড়ক পথে আসছে বিভিন্ন মাদক। টাঙ্গাইল জেলার পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে মাদকের অভয়ারণ্য। জেলার নাগরপুর, ভূঞাপুর, কালিহাতী ও টাঙ্গাইল সদর উপজেলার নদী সংশ্লিষ্ট এলাকা ও শহরের কান্দাপাড়া যৌনপল্লীকে বেছে নিয়েছে মাদক কারবারিরা। সুযোগ বুঝে সড়ক পথকে ব্যবহার করছে তারা।
জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলা গুলো থেকে মাদক ঢুকছে টাঙ্গাইলের প্রবেশদ্বার খ্যাত এলেঙ্গা এলাকায়। এরপর এখান থেকেই ঢাকা, গাজীপুরসহ টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিভিন্ন পদ্ধতিতে মাদক ছড়িয়ে পরছে। শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় রাতের আধারে অলিগলিতে বিক্রয় হচ্ছে সর্বনাশা মাদক। আবার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে হাতেহাতে। টাঙ্গাইল শহর ও উপজেলার অনেক এলাকায় মাদকের ছড়াছড়ি।
স্থানীয়রা জানান, মাদকদ্রব্য পরিবহনে নিরাপদ রুট হিসাবে সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলা হয়ে নাগরপুর উপজেলার দপ্তিয়র, চর সলিমাবাদ, আটাপাড়া, শাহাজানি চরাঞ্চল, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাতুলি, কাকুয়া, হুগড়া, ভূঞাপুর উপজেলার নিকরাইল, গোবিন্দাসী, অর্জুনা, গাবসারা, কালিহাতী উপজেলার গোহালিয়াবাড়ি যমুনা নদীর চরাঞ্চল ব্যবহার করা হচ্ছে।
জেলা পুলিশ জানায়, মাদক নির্মূলে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও র্যাব পৃথকভাবে কাজ করছে। গত সাত মাসে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ ৮২ কেজি গাঁজা, ৪ হাজার ৭৪৮ পিস ইয়াবা, ৭২৫.১০ গ্রাম হেরোইন, ১০৮৫.৩৬ গ্রাম দেশি-বিদেশি মদ ও ৫৯৫ বোতল ফেনসিডিল জাতীয় মাদক উদ্ধার করেছে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। এসব মাদকের বেশিরভাগ বড় বড় চালান উদ্ধার ও মাদক কারবারিদের বেশির ভাগই আটক হয়েছে টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের জালে। উদ্ধার অভিযানে গত সাত মাসে ৪৭৩ জন মাদক কারবারির নামে ৩৩৮ টি মামলা রজ্জু করেছে জেলা পুলিশ।
অপরদিকে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর হতে জানা যায়, গত সাত মাসে ৮২ কেজি গাঁজা, ৪ হাজার ৭৪৮ পিস ইয়াবা, ৮৫.৫ গ্রাম হেরোইন, ৪১.২৫ গ্রাম মদ ও ১০ বোতল ফেনসিডিল ও টাপেন্টাডল ৩ হাজার ৪ শত ৮৮ টি ট্যাবলেট, ১০ হাজার লিটার ওয়াশ জাতীয় মাদক উদ্ধার করেছে।
অভিযানে মাদক কারবারিদের থেকে নগদ ১৪ লক্ষ ৩১ হাজার টাকাসহ উদ্ধারকৃত মাদকের আনুমানিক মূল্য ৪৭ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা উদ্ধার করেছে। উদ্ধার অভিযানে গত সাত মাসে ১৯৭ জন মাদক কারবারির নামে ১৯৬ টি মামলা রজ্জু করেছে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
এদিকে র্যাব ১৪ সিপিসি ৩ জানায়, গত সাত মাসে ৮২ কেজি গাঁজা, ৪ হাজার ৭৪৮ পিস ইয়াবা, ১৬৭ গ্রাম হেরোইন, ৯৮ লিটার দেশি মদ ও ৪৩১ বোতল ফেনসিডিল জাতীয় মাদক উদ্ধার করেছে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা। উদ্ধার অভিযানে এ সাত মাসে ৭ জন মাদক কারবারির নামে ৩টি মামলা রজ্জু করতে সহায়তা করেছে র্যাব। এই ত্রিমুখী অভিযানে বড় বড় মাদকের চালান উদ্ধার ও মাদক কারবারিদের আটকের পরেও থামছে না মাদকের ভয়াল থাবা। আইনের ফাঁকফোকড়ে বেরিয়ে আসছে কারবারিরা। আবার নতুন উদ্যমে ভিন্নতর কৌশলে শুরু করছে মাদক ব্যবসা।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “টাঙ্গাইলবাসীর জনজীবনের নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি মাদক নির্মূলে প্রতিনিয়ত কাজ করছে জেলা পুলিশ। সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ধর্মীয় উপাসনালয় মসজিদ-মন্দিরে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। আবার তাদেরকে সুযোগও দিতে হবে সুপথে ফেরার।”
তিনি আরো বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীর তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশে তা খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবকদের। পুলিশের একার পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। পুলিশের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষকে মাদক নির্মূলে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই মাদক নির্মূল হবে।”