
প্রতীকী ছবি
মায়ের দুধ শুধু খাবার নয়; এটি এক জীবন্ত ওষুধ। গবেষণায় দেখা গেছে কোনো ফর্মুলা দুধই এর সঙ্গে তুলনীয় নয়। প্রথম দুধ, যাকে কলোস্ট্রাম বলা হয়, ঘন ও হলুদ রঙের হয়। এতে প্রচুর প্রোটিন এবং অ্যান্টিবডি থাকে, যেমন সিক্রেটরি IgA এবং ল্যাক্টোফেরিন, যা সংক্রমণ ও প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। বুকের দুধ খাওয়ানো চলতে থাকলে দুধ ধীরে ধীরে সাদা হয় এবং এতে ল্যাক্টোজ ও ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যায়- যা শিশুর শক্তির মূল উৎস।
বুকের দুধ সময়ের সাথে সাথে বদলায়, এমনকি একবার দুধ খাওয়ানোর মাঝেই। শুরুর দুধ বেশি পাতলা ও পানির মতো হয়, আর পরে আসা দুধে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। দুধের উপাদান শিশুর বয়স, শিশু প্রিম্যাচিউর হলে, এমনকি মায়ের খাদ্যাভ্যাসের ওপরও নির্ভর করে। এতে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন যেমন কেসিন, আলফা-ল্যাকটালবুমিন এবং বিভিন্ন এনজাইম থাকে যা শিশুর হজমে সহায়ক। বুকের দুধের চর্বি শিশুর মস্তিষ্ক ও চোখের বিকাশে ভূমিকা রাখে এবং মায়ের খাদ্যে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (যেমন ওমেগা-৩) প্রতিফলিত করে।
এছাড়াও এতে থাকে কার্বোহাইড্রেট, যেমন ল্যাক্টোজ যা শক্তি জোগায় এবং অলিগোস্যাকারাইডস, যা উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়তে সহায়তা করে এবং ক্ষতিকর জীবাণুকে বাধা দেয়। ভিটামিন ও খনিজ সাধারণত পর্যাপ্ত থাকে, তবে কিছু ক্ষেত্রে ভিটামিন বি১২, ডি এবং আয়োডিন বাড়তি প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু পুষ্টিই নয়, বুকের দুধে হরমোন, স্টেম সেল, গ্রোথ ফ্যাক্টর এবং অনন্য উপাদান যেমন HAMLET ও TRAIL থাকে- যা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে পারে কিন্তু সুস্থ কোষের ক্ষতি করে না। আরো আছে মাইক্রো RNA ও মাইও-ইনোসিটল, যা রোগ প্রতিরোধ ও মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে সিজারিয়ান করে জন্মানো শিশুর জন্য মায়ের দুধের মাইক্রোবায়োম খুব উপকারী, কারণ এটি তাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য গঠনে সহায়ক।
যত বেশি সময় শিশু মায়ের দুধ খায়, তত বেশি উপকার পায়। বুকের দুধের পরবর্তী পর্যায়ে প্রোটিন, অ্যান্টিবডি এবং রোগপ্রতিরোধী উপাদান আরো বেশি থাকে। এমনকি টডলারদের মায়ের দুধও পুষ্টিকর ও সুরক্ষামূলক থাকে, এর ৮৭% পানি শিশুকে গরম আবহাওয়াতেও পর্যাপ্তভাবে হাইড্রেটেড রাখে এবং এর উপাদান শিশুর চাহিদা অনুযায়ী মানিয়ে নেয়। দুধ পাম্প করে খাওয়ানোও মূল্যবান, তবে সরাসরি দুধ খাওয়ালে ত্বক-সংস্পর্শের মাধ্যমে অতিরিক্ত রোগপ্রতিরোধী উপকার পাওয়া যায়।
কোনো ফর্মুলা দুধ মায়ের দুধের জীবন্ত, বায়ো-অ্যাকটিভ জটিলতার সমকক্ষ নয়। ফর্মুলা ও মায়ের দুধের পার্থক্য মৌলিক- একটি স্থির, অপরিবর্তনীয় পণ্য, আর অন্যটি একটি গতিশীল, জীবন্ত তরল, যা শিশুর নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেয়। ফর্মুলা শুধু ন্যূনতম পুষ্টিগত মান পূরণ করার জন্য তৈরি, কিন্তু এতে নেই মায়ের দুধের সেই পরিবর্তনশীল উপাদান, যা শিশুর তাত্ক্ষণিক স্বাস্থ্য ও বিকাশগত প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া দেয়। ফর্মুলার একটি বোতল প্রথম দিনে যেমন থাকে, একমাস পরে বানালেও তেমনই থাকে। এটি ফ্যাট বা প্রোটিনের পরিমাণ পরিবর্তন করতে পারে না, আবার নতুন কোনো সংক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডিও তৈরি করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, এখন কিছু ফর্মুলায় প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক যোগ করা হয় অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য, কিন্তু এগুলো কখনোই মায়ের দুধের মতো শিশুর পরিবর্তনশীল অন্ত্র-মাইক্রোবায়োমের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না।
লেখাঃ গণমাধ্যম কর্মী