
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। এই স্তরে বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও নানা চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও গবেষণা বলছে, ঝরে পড়া, শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
করোনার ধাক্কায় কমে যাওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে। এক বছরের ব্যবধানে দেশে প্রায় চার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় বাড়লেও এর সব কটিই বেসরকারি। একই সময়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় দুই লাখ। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, ঝরে পড়ার হার উল্টো বেড়ে গেছে ৩ শতাংশ।
এই তথ্য উঠে এসেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারিতে (এপিএসসি), যা গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে।
সেখানে দেখা গেছে ২০২০ সালে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। করোনা শুরুর পর বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমতে থাকে—২০২১ সালে নেমে আসে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজারে, আর ২০২২ সালে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৪ হাজারে। তবে ২০২৩ সালে সামান্য বৃদ্ধি পায়, ২০২৪ সালে একলাফে প্রায় চার হাজার বেড়ে আবার দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি।
শিক্ষার্থীর সংখ্যাও একইভাবে ওঠানামা করেছে। ২০২০ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২ কোটি ১৫ লাখের বেশি, যা ২০২১ সালে কমে যায় সাড়ে ১৪ লাখ। ২০২৩ সালে সংখ্যা নেমে যায় ২ কোটির নিচে। তবে ২০২৪ সালে আবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজারে।
২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা কমেছে ৮৮৯ জন। বর্তমানে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন। অথচ প্রধান শিক্ষক পদের ৬৫ হাজারের মধ্যে ৩৪ হাজারের বেশি শূন্য। পাশাপাশি সাড়ে ২৪ হাজার সহকারী শিক্ষকের পদও খালি রয়েছে।
যদিও সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে শিক্ষকের মোট সংখ্যা ৫৭ হাজার বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাত লাখের বেশি। তবুও বিদ্যালয়ভেদে সংকট প্রকট। যেমন হবিগঞ্জ পৌর এলাকার নীরদাময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯৯ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ৫ জন—প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক।
ঝরে পড়া বেড়েছে২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ঝরে পড়া কমলেও ২০২৪ সালে আবার বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭ শতাংশের বেশি, তা ২০২৩ সালে কমে আসে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশে। কিন্তু নতুন শুমারি বলছে, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে।
এর মধ্যে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে—২০২৩ সালে যেখানে তা ছিল ১৪ শতাংশের বেশি, এখন তা প্রায় ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে হার বেড়েছে ১ শতাংশের মতো।
ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগে ঝরে পড়া তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি জেলাতেই ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশের ওপরে। নেত্রকোনায় হার সবচেয়ে বেশি—৪৪ শতাংশ। গবেষকেরা মনে করছেন, এসব অঞ্চলে দারিদ্র্য ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থার কারণে ঝরে পড়া বেশি হচ্ছে।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া জরুরি—
১. ঝরে পড়া রোধে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের সহায়তা বৃদ্ধি।
২. শিক্ষক সংকট নিরসনে দ্রুত নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা।
৩. বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সুবিধা উন্নয়ন।
শুমারির সার্বিক তথ্য প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ বলেন, বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক। তবে ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাওয়া উদ্বেগজনক। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগের তথ্য দারিদ্র্য ও ভৌগোলিক বৈষম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকটও গুরুতর আকার ধারণ করেছে। অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের জায়গায় নতুন নিয়োগ না হওয়ায় বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সরকারকে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগসহ ঝরে পড়া রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোতে অগ্রগতির পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও ঝরে পড়া এবং শিক্ষক সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব, যা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর