খাল দখলে আর বালু ভরাটে বন্ধ হয়ে গেছে শীতলক্ষ্যার সংযোগ, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে শতাধিক পরিবার

রূপগঞ্জে গাজীপুর-মদনপুর এশিয়ান হাইওয়ে (ঢাকা বাইপাস) প্রশস্তকরণের কাজ করতে গিয়ে সড়কের পাশে থাকা সরকারি খালগুলো ড্রেজার দিয়ে বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। এতে বন্ধ হয়ে গেছে পানির স্বাভাবিক চলাচল। অপরদিকে খালগুলোর ওপর গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা, যার ফলে শীতলক্ষ্যা নদীর সাথে খালের প্রাকৃতিক সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে বেশ কয়েকটি খাল। এ অবস্থায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে পড়ছে আশপাশের শতাধিক পরিবার।
জানা গেছে, ১৯৮১ সালে ‘নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী ইরিগেশন প্রজেক্ট’ (এনএনডি)–এর আওতায় কাঞ্চন, মুড়াপাড়া, ভুলতা ও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ২০ গ্রামে কৃষি জমিতে পানি সরবরাহের সুবিধার্থে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে জাইকা (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি)। সেই সময় কাঞ্চন থেকে রূপসী ও ভুলতা গাউসিয়া পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিভিন্ন খাল খনন করে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নজরদারির অভাবে খালের উপর গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতবাড়ি, বালুর গদি, শিল্প কারখানা এবং দোকানপাট। একাধিক স্থানে খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে খালের স্বাভাবিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টাটকির খাল, সুতালরির খাল, দাগিরমার খাল, কানি বিল ও মাউচ্চা বিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি খালগুলোর উপর নির্মাণ করা হয়েছে বাড়ি, কারখানা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা। হান্ডিমার্কেট এলাকায় খালের উপর গড়ে উঠেছে এটলাস টয়লেট্রিস, এনডিই রেডিমিক্স, ম্যাংসাং সার্ভিসিং সেন্টারসহ বহু প্রতিষ্ঠান।
টেকপাড়া, বারুইপাড়া, হাটাব ও পিঠাঘুড়িসহ ৩০টি গ্রামের অন্তত ২ হাজার বিঘা কৃষিজমি সরাসরি এই খালগুলোর পানির উপর নির্ভরশীল। তবে খালগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং শুকনো মৌসুমে দেখা দিচ্ছে পানির সংকট।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, “৪-৫টি খাল দখল করে সেখানে অর্ধশত পাকা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। জেলা প্রশাসককে লিখিত আবেদন করেও কোনো ফল পাইনি।”
বেলতলা এলাকার শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সরকারি খাল ও জমিতে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেছে এনডিই রেডিমিক্স, ইনডেক্স পাওয়ারপ্ল্যান্ট, এটলাস টয়লেট্রিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছে জলাবদ্ধতা।”
এদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা দায় স্বীকার করতে চাননি। এনডিই রেডিমিক্সের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা খাল দখল করিনি, তবে মাঝে মাঝে বর্জ্য খালে পড়ে যায়। সেটা শ্রমিক দিয়ে পরিষ্কার করি।” এটলাস টয়লেট্রিসের জেনারেল ম্যানেজার বলেন, “খাল দখলের বিষয়টি আমার জানা নেই।”
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা বিভাগীয় উপ-প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে খাল উদ্ধার সংক্রান্ত দরখাস্ত পাঠানো হয়েছে। খুব শিগগিরই উদ্ধার কাজ শুরু হবে।”
সড়ক ও জনপথ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী এ.এস.এম ইলিয়াস শাহ বলেন, “সড়কের পাশে খাল ভরাটের বিষয়ে বিস্তারিত জানা নেই, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “সরকারি খাল, রাস্তা ও খাস জমি উদ্ধারে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু খাল উদ্ধারও করা হয়েছে। সড়ক বিভাগকেও খাল খননের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ রক্ষা করা না গেলে শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে সংযোগহীন এই খালগুলোতে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা। দখলদার উচ্ছেদ, খাল পুনঃখনন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে