
সংগৃহীত ছবি
নব্বই দশকের সুদর্শন অভিনেতা শাকিল খান। যাদের শৈশব ও কৈশোরকাল ছিল সেই সময়ে কিংবা যারা চলচ্চিত্রপ্রেমী, তাদের কাছে শাকিল খান একটি আবেগ আর ভালোবাসার নাম। রেডিও, সিডি, বিসিডি কিংবা ফিতার জগতে যারা আগ্রহী ছিলেন, তাদের মধ্যে শাকিল খান ছিল অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র। অভিনয়, গান, সংলাপ এবং মায়াবী চাহনীর জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
শাকিল খান ১৯৯৭ সালে প্রথম সিনেমায় অভিনয় শুরু করলেও তার চলচ্চিত্র জগতে আগমন হয় ১৯৯৪ সালে। শুটিং ও ফটোশুটের মাধ্যমে তিনি দর্শকের মনে নিজের একটি আলাদা স্থান করে নেন। অনেকেই তখন তাকে “প্যাকেজ শিল্পী” হিসেবে সম্বোধন করত, কারণ তিনি অভিনয় ছাড়াও গানের কোরিওগ্রাফি, সংলাপ, স্ক্রিপ্ট লেখালেখি এবং সিনেমার অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষ ছিলেন। তার কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। যেমন— “ভালোবেসে অন্তরে অন্তরে”, “তোমায় দেখলে মনে হয় হাজার বছর আগেও পরিচয় ছিল”, “প্রতিদিন তোমাকে আমি চাই” ইত্যাদি।
শাকিলের অভিনয়ে প্রথমদিকে শিশুসূলভ কিছু দিক থাকলেও সময়ের সঙ্গে তার পারফরম্যান্স উন্নত হয়। তার অভিনয়ের নিজস্ব একটি ধাঁচ ছিল যা তাকে ভিন্ন করে তুলে ধরে। রোমান্টিক চরিত্রে তিনি বেশ পারদর্শী ছিলেন এবং সহজেই দর্শকের মন জয় করতেন।
তার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার খুব দীর্ঘ ছিল না, তবে স্বল্প সময়ে তিনি তার প্রতিভা দিয়ে সময়ের জনপ্রিয় তারকাদের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতা করেন। তিনি অল্প সময়েই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং একইসঙ্গে প্রশংসিত হন। যদিও পরে চলচ্চিত্র জগৎ থেকে তিনি একটু পিছিয়ে গেলেও, তার অনুপস্থিতি ঢালিউডের দর্শকদের জন্য এক বড় শূন্যতা রয়ে গেছে।
শাকিল খান এ বিষয়ে বলেন, “দর্শকরা আমাকে খুব ভালোবাসেন। হয়তো তাদের কাছে আমি কম সময় ধরে পেশা করেছি, এজন্য তারা একটু অভিমানী। তবে আমি কখনো পুরোপুরি চলচ্চিত্র থেকে সরে যাইনি। অভিনয় কম করলেও নির্মাণ ও অন্যান্য কাজে যুক্ত ছিলাম। অনেক সময় আমি নিজের নাম প্রকাশ না করেও ভালো সিনেমার পেছনে ছিলাম।”
শাকিল খান শুধু সিনেমায় নয়, নাটকেও অভিনয় করেছেন এবং তার অভিনীত নাটকগুলোও দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ব্যবসায়েও জড়িত ছিলেন এবং চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। সবসময় শিল্পীদের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন।
শাকিল খানের হঠাৎ অভিনয় থেকে সরে যাওয়া ঢালিউডের দর্শকদের কাছে এখনও আফসোসের বিষয়। ভিসিআরের দিনে শাবনূরের সঙ্গে তার জুটির জনপ্রিয়তা অসাধারণ ছিল। চায়ের দোকানে, ভিসিআর ঘরে দর্শকরা তাদের প্রেমের গল্প মুগ্ধচিত্তে দেখতেন। শাবনূর ও শাকিলের রোমান্টিক কেমিস্ট্রি দর্শকের কাছে চিরস্মরণীয়। এছাড়া পূর্ণিমা, মৌসুমী এবং পপির সঙ্গে তার অভিনয়ও দর্শক প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে শাকিল-পপি জুটিকে তখন চলচ্চিত্র পাড়ায় বিশেষভাবে আলোচনা করা হতো।
“জীবনে বসন্ত এসেছে, ফুলে ফুলে ভরে গেছে মন, ও বান্ধবী অনামিকা, আজ তোমাকেই প্রয়োজন”— এই গানটির সঙ্গে শাকিলের অভিনয় আজও দর্শকের হৃদয়ে বাজে। গিটার বাজানোর তার স্টাইল ছিল অসাধারণ। শাবনূরের অসাধারণ নাচ আর এক্সপ্রেশন মিলে এই গানের দৃশ্য সবার মনে গেঁথে আছে।
“নারীর মন” সিনেমার “ঘুমিয়ে থাকো গো সজনী” গানটির আগে শাবনূর যখন শাকিলকে গান শুনতে বলেন, তার হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ানোর ভঙ্গিটা আজও মনে পড়ে।
“লাল লাল গালে যার ছোট্ট তিল” এবং “আমি করব তারে বউ” এর মতো গানগুলোও জনপ্রিয়।
শাকিল খান নিজেও মানেন না যে তিনি অভিনয় ছেড়ে গেছেন। তিনি বলেন, “অভিনয় আর পরিবার নিয়ে আমি আছি। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষ আমাকে চিনেছে, কিভাবে আমি বিদায় নিতে পারি? হয়তো শিগগিরই দর্শক আমাকে নতুন লুকে পর্দায় দেখতে পাবেন।”
শাকিল খানের জনপ্রিয় সিনেমার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—“আমার ঘর আমার বেহেশত”, “মা যখন বিচারক”, “এ মন তোমাকে দিলাম”, “পাহাড়াদার”, “বিয়ের ফুল”, “মগের মুল্লুক” ইত্যাদি।
নিজের সাফল্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো সিনেমায় সাফল্য পাওয়ার জন্য আসিনি। অভিনয় করেই সংসার চালাতে চেয়েছি না। দর্শকের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। এই ভালোবাসা নিয়েই আমি বাঁচতে চাই।”