
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই উপজেলার কোনো না কোনো এলাকায় রাতে চুরি, ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। শুধু তাই নয়, ডাকাতেরা লুটে নিচ্ছে ব্যবসায়ীদের টাকা-পয়সা ও বসতঘরের মূল্যবান মালামাল।
গত ২৪ জুন রাত ১০টার দিকে দুর্গাপুর ইউনিয়নের পূর্ব কলসভাঙ্গা গ্রামে মাওলানা বদিউজ্জামান বাহারের মাদ্রাসার সামনে বিজিবি সদস্য মো. নাঈমের বসতঘরে তালা ভেঙে এবং শাবল দিয়ে স্টিলের আলমারি চূর্ণবিচূর্ণ করে ডাকাতরা ঘরের মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
পৌরসভার বারোআনী গ্রামের গরু ব্যবসায়ী মোফাজ্জল হোসেন দেওয়ান বলেন, ‘আমার বাড়িতে ৩টি গরু ছিল। একদল ডাকাত রাতের আঁধারে একটি পিকআপভ্যানে করে গরুগুলো নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমার দুই ছেলে বাধা দিলে ডাকাতরা ছুরি, চাপাতি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাদের মারাত্মক জখম করে গরু নিয়ে পালিয়ে যায়।’
সাহাবাজকান্দি গ্রামের অটোরিকশাচালক নুর হোসেন বলেন, ‘কিস্তিতে টাকা তুলে ও ধারদেনা করে একটি অটোরিকশা কিনেছিলাম। সপ্তাহ খানেক চালানোর পর এক রাতে চার্জে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে দেখি, রিকশাটা চুরি হয়ে গেছে।’
গজরা ইউনিয়নের শাহাদাৎ বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু টাকা এনে পুরোনো একটি অটোরিকশা কিনেছিলাম। এক রাতে বৃষ্টির মধ্যে গাড়িটি চার্জে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। গভীর রাতে উঠে দেখি, রিকশাটি নেই। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজার পর ফেসবুকে ছবিসহ পোস্ট দিলে ১৮ দিন পর শাহরাস্তি থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি।’
বাড়ি ভাঙা গ্রামের মোহন মিয়া বলেন, ‘দু’দিন আগে আমার ঘরের আলমারি ও শোকেসের তালা ভেঙে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে নিয়ে যায়।’
আমিনপুর গ্রামের সোহাগ বলেন, ‘আমার অটোর ব্যাটারিগুলো রাতের আঁধারে চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন গাড়িটা বাড়িতে পড়ে আছে। কিস্তিতে কিনেছিলাম, কিন্তু এখন কিস্তির টাকা দিতে পারছি না।’
গত এক মাসে উপজেলায় চুরি ও ডাকাতির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান। এর কিছুদিন পর পুলিশ কাজে ফিরলেও তাদের মধ্যে এখনও ভীতি কাজ করছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর না হওয়ায় অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ফলে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এলাকাবাসী।
তবে প্রশ্ন উঠেছে- আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা নানা অপরাধে জড়িত ছিল, তারা কি ছদ্মবেশে এসব অপরাধ করছে, নাকি নতুন কোনো চক্র এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত?
এদিকে, প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় শ্রীরায়েরচর ব্রিজ থেকে মতলব সেতুর বেড়িবাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই এখানে প্রায় প্রতি রাতেই ডাকাতি, গরু চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটেছে। এখনো এসব অপরাধ অব্যাহত রয়েছে।
মতলব উত্তর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ফারুক হোসেন জানান, ‘প্রায় প্রতিদিন মেঘনা-ধনাগোদা বেড়িবাঁধের ওপর, সুজাতপুর হাইওয়ে রোড, সাহেববাজার ব্রিজ, মোহনপুর পর্যটন কেন্দ্র থেকে শুরু করে ষাটনল এলাকাজুড়ে চুরি ও ছিনতাই হচ্ছে। ওই এলাকাগুলো অন্ধকার হওয়ায় ছিনতাইকারীরা সেগুলোকে নিরাপদ পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে। পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।’
মতলব থানার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খায়রুল কবির বলেন, ‘মতলব উত্তরের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে। চিহ্নিত চোর-ডাকাতদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম